আবেগ-অশ্রুতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন মেসি
আবেগঘন পরিবেশে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে বিদায় নিয়েছেন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। মঙ্গলবার বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচ খেলেন তিনি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে মেসিকে বিদায় জানাতে স্টেডিয়ামে জড়ো হন প্রায় ৮৫ হাজার সমর্থক।
বিদায়ী ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে বেনিনকে হারায়। ৩৯ বছর বয়সী মেসি ম্যাচের ৭১তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা ১২৬-এ নিয়ে যান। এর আগে নিকোলাস ওতামেন্দির করা প্রথম গোলটিতে সহায়তা করেন তিনি। দলের হয়ে আরেকটি গোল করেন নিকো পাজ।
তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে রাতটির আবেগই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেসির বিদায়ী ম্যাচটিকে ঘিরে আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’।
ম্যাচের আগে মেসিকে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। আর্জেন্টিনা দলের বাস স্টেডিয়ামের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে হাজারো সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন। সেই দৃশ্য দেখে মেসির চোখে পানি চলে আসে।
মাঠে মেসির সঙ্গে প্রবেশ করে তার তিন সন্তান। গ্যালারির ভিআইপি বক্স থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি তাকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
খেলা শুরুর আগে মাঠে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির বিশাল প্রতিকৃতি রাখা হয়। তার ওপরে লেখা ছিল ‘গ্রাসিয়াস’—অর্থাৎ ‘ধন্যবাদ’। সমর্থকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।
জাতীয় সংগীতের সময়ও মেসিকে আবেগ ধরে রাখতে দেখা যায়। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সাবেক সেনা সদস্য ফাবিও সান্তানার পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় মাঠে ‘দ্য মালভিনাস আর আর্জেন্টাইন’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।
ম্যাচের ১০তম মিনিটে খেলা থামিয়ে দেওয়া হয়। মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট ধরে তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান সমর্থকেরা।
এরপর দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিদায়ী ম্যাচটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলেন মেসি।
‘আমি সবটুকু দিয়ে দিয়েছি’
শেষ বাঁশি বাজার পর স্টেডিয়ামের আকাশে ড্রোন শো শুরু হয়। ড্রোনের আলোয় আকাশে মেসির ছবি ফুটিয়ে তোলা হয় এবং আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকাকে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।
এর আগে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের কয়েক মাস পর জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায়ের ঘোষণা আসে। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ১-০ গোলে হারের পর মেসিকে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল।
তখন মেসি বলেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি নিজের সবটুকু দিয়েছেন এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।
বিদায়ী ম্যাচের আগে বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে।
মেসি অতীতে পড়াশোনায় আরও বেশি সময় দিতে না পারার বিষয়ে আফসোসের কথা বলেছিলেন। সম্মানসূচক ডক্টরেট পাওয়ার পর মজা করে তিনি বলেন, ‘আমি যে এখন বলতে পারি, আমি সম্মানসূচক ডাক্তার!’
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরের বাইরে সমর্থকেরা মেসির ছবি সম্বলিত বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকা প্রদর্শন করেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমার জীবনের আনন্দ।’
বিশ্বজুড়ে মেসিকে শ্রদ্ধা
মেসির সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ নেইমারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে শ্রদ্ধা জানান।
নেইমার বলেন, শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্ব মেসির প্রতি কৃতজ্ঞ। ফুটবলের জন্য তার অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেসি তাকে এই খেলাটিকে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।
মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামির চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। তবে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২২ সালে। কাতার বিশ্বকাপে দলকে শিরোপা জিতিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটান তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির ক্যারিয়ারে রয়েছে একটি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা। ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা জেতার পাশাপাশি ২০১৪ ও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।
তবে সমর্থকদের কাছে মেসির বিদায়ের রাতটি শুধু পরিসংখ্যানের হিসাব ছিল না।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৫২ বছর বয়সী সমর্থক সিসিলিয়া আদ্রিয়ানো বলেন, ‘আমি মনে করি মেসি সবকিছু দিয়েছেন, একেবারে সবকিছু। তাই তার বিদায়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। তিনি এর চেয়েও বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য। এখন তার নিজের মতো করে উপভোগ করা এবং বিশ্রাম নেওয়ার সময়।’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন