গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: ৭৯তম স্থানে বাংলাদেশ
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬-এ ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম। আগের প্রতিবেদনে ২৪তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের এবার উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।
সামগ্রিক অবস্থানের অবনতি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেশটির পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকলেও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর কমেছে
২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক জেন্ডার পারিটি স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ২ শতাংশে। আগের প্রতিবেদনে এই স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে নারী ও পুরুষের পার্থক্য চারটি প্রধান ক্ষেত্রে পরিমাপ করা হয়—
1. অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ
2. শিক্ষাগত অর্জন
3. স্বাস্থ্য ও টিকে থাকা
4. রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
এই সূচক মূলত একটি দেশে নারী-পুরুষের বিদ্যমান ব্যবধান কতটা কমেছে তা পরিমাপ করে। এটি সরাসরি মানুষের সামগ্রিক জীবনমানের সূচক নয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ধরনের পতন
বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থানের অবনতির অন্যতম কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সূচকে উল্লেখযোগ্য পতন।
এ বছর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংসদে নারীদের আসন রয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে গত পাঁচ দশকে নারী রাষ্ট্রপ্রধান থাকার বিষয়টি বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো পূর্ণ সমতা স্কোর ধরে রেখেছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদে মন্ত্রিসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জেন্ডার গ্যাপের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র হলো অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ।
এই খাতে বাংলাদেশ নারী-পুরুষের ব্যবধানের মাত্র ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।
প্রতিবেদনে নারীদের আনুমানিক আয়, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এবং উচ্চপর্যায়ের পদে প্রতিনিধিত্ব—বিভিন্ন সূচকে অবনতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নারীদের কর্মসংস্থান, আয় এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র হলো শিক্ষা।
২০২৬ সালে শিক্ষাগত অর্জন সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৯৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি স্কোর।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় এখনো কিছুটা ব্যবধান রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় কম।
দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
স্বাস্থ্য সূচকে অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত
স্বাস্থ্য ও টিকে থাকা সূচকে বাংলাদেশ প্রায় ৯৬ শতাংশ জেন্ডার গ্যাপ পূরণ করেছে।
আগের বছরের তুলনায় এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন হয়নি।
জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমতা অর্জন করেছে। তবে স্বাস্থ্যকর আয়ু এবং প্রজননস্বাস্থ্যের মতো কিছু ক্ষেত্রে এখনো ব্যবধান রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো শীর্ষে বাংলাদেশ
সামগ্রিক বৈশ্বিক অবস্থানের অবনতি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়া সামগ্রিক জেন্ডার ব্যবধানের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পূরণ করেছে।
তবে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমান গতিতে অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ণ জেন্ডার সমতা অর্জনে আরও প্রায় ১৪৯ বছর সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বে শীর্ষে আইসল্যান্ড
২০২৬ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড। এরপর রয়েছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য।
অন্যদিকে বৈশ্বিক তালিকার নিচের দিকে রয়েছে চাদ, ইরান ও পাকিস্তান।
বিশ্বব্যাপী ১৪৫টি অর্থনীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক জেন্ডার ব্যবধানের ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে।
তবে বর্তমান গতিতে অগ্রগতি চলতে থাকলে বিশ্বব্যাপী পূর্ণ জেন্ডার সমতা অর্জনে আরও প্রায় ১২০ বছর সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে প্রতিবেদন
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে।
শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এবং স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, আয়, কর্মসংস্থান, উচ্চপর্যায়ের পদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান বজায় থাকলেও বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে বড় ধরনের পতন নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।
নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, নেতৃত্ব এবং জনজীবনে অংশগ্রহণ বাড়ানো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জেন্ডার সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন