পেনশনের নামে কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ, ২৬ অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন
সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের বকেয়া পেনশনের অর্থ দেওয়ার সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবহার করে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২৬ জন পেনশনভোগীর নামে ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়াই বকেয়া পেনশনের বিল তৈরি করে প্রথমে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হতো। পরে তাঁদের নির্দিষ্ট কমিশন দেওয়ার পর বাকি অর্থ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। এরপর ভুয়া ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে বলে নথিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
পেনশনের চেয়ে লাখ লাখ টাকা বেশি
বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আক্তার হোসেনের ক্ষেত্রে এমন লেনদেনের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জুনে তাঁর নিয়মিত পেনশন পাওয়ার কথা ছিল ১৫ হাজার ৪০৬ টাকা। কিন্তু ওই মাসে তাঁর হিসাবে নিয়মিত পেনশনের পাশাপাশি প্রায় ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত জমা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পেনশন কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে এই অর্থ তাঁর হিসাবে পাঠানো হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ থেকে তিনি প্রায় ১ লাখ টাকা কমিশন হিসেবে রাখেন এবং অবশিষ্ট টাকা চক্রটির নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেন।
তদন্তে দেখা গেছে, এক বছরের বেশি সময়ে আক্তার হোসেনের হিসাবে পেনশনের বাইরে প্রায় ৭২ লাখ টাকা জমা হয়েছিল। অথচ একই সময়ে তাঁর নিয়মিত পেনশন ও উৎসব ভাতা মিলিয়ে পাওয়ার কথা ছিল মাত্র দুই লাখ টাকার কিছু বেশি।
একই কৌশলে আরও পেনশনভোগীর হিসাব ব্যবহার
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু আক্তার হোসেনের হিসাব নয়, আরও বহু অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সরকারি অর্থ সরানো হয়েছে।
প্রথম দিকে ২৩ জন পেনশনভোগীর হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। পরে তদন্তের পরিধি বাড়ালে ২৬ জনের হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া যায়।
নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মাসিক পেনশন ছিল ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু তাঁদের হিসাবে প্রায় প্রতি মাসেই পেনশনের বাইরে একাধিকবার বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি লেনদেনে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকার সীমা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা করে পাঠানো হয়।
এক বছরের বেশি সময়ে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য জি এম সাজ্জাদ হোসেনের হিসাবে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, মো. হারুন অর রশিদ মৃধার হিসাবে আট মাসে ২২টি লেনদেনে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা এবং মো. শাহিনুর ইসলামের হিসাবে ছয় মাসে ২০টি লেনদেনে প্রায় ৪০ লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া মো. শাহ আলীর হিসাবে তিন মাসে প্রায় ১৬ লাখ, আমজাদ হোসেনের হিসাবে প্রায় ১২ লাখ এবং খন্দকার আবুল হোসাইনের হিসাবে এক মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়। শুধু এই সাতজনের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেই আড়াই কোটির বেশি টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।
তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ফেরত যেত টাকা
অস্বাভাবিক লেনদেনের শিকার পাঁচ পেনশনভোগীর সঙ্গে কথা বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, তাঁদের কয়েকজনের ক্ষেত্রে অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান, জি এম সাজ্জাদ হোসেন এবং এম শাহিন নামে আরেক পেনশনভোগীর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই ধাপে প্রায় ৪ লাখ টাকা করে ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হতো। এর মধ্যে কখনো ১ লাখ, আবার কখনো ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন হিসেবে রাখা হতো। অবশিষ্ট অর্থ আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত পাঠানো হতো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত মার্চ ও এপ্রিলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের খুলনা ও রাজশাহী শাখা থেকে আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এ ছাড়া আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে আদনান এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি এবং টাঙ্গাইল শাখা থেকে তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ৩ লাখ টাকা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
জি এম সাজ্জাদ হোসেনের দাবি, অডিট অফিসের শাহীনুর রহমান ও অ্যাকাউন্টস অফিসার ইশরাত জাহান এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি তাঁদের কথা বিশ্বাস করেই এই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে সমস্যায় পড়েছেন।
অন্যদিকে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আমজাদ হোসেন জানান, পূর্বপরিচিত এম শাহিন তাঁর বাবার বকেয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার কথা বলে তাঁর ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিয়েছিলেন। পরে তিন মাসে ছয়টি লেনদেনে প্রায় ১২ লাখ টাকা তাঁর হিসাবে জমা হয়। তিনি দাবি করেন, কোনো কমিশন নেননি এবং পেনশন বন্ধ হওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন।
ভুয়া ট্রেজারি চালানে অর্থ ফেরতের তথ্য
সিসিডিএফ কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোনো পেনশনভোগীর হিসাবে ভুলবশত অতিরিক্ত অর্থ চলে গেলে নিয়ম অনুযায়ী ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার কথা। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই ভুয়া চালান ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তদন্তে এমন কয়েকটি চালানের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে বড় অঙ্কের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হলেও অনলাইনে যাচাই করে প্রকৃত চালানে খুব সামান্য অর্থ জমার তথ্য পাওয়া যায়।
একটি নথিতে শাহীনুর ইসলামের নামে প্রায় ১৬ লাখ টাকা জমা দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট চালানে প্রকৃত জমার পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকা। অন্য একটি ঘটনায় প্রায় ৮ লাখ টাকা ফেরতের বিপরীতে প্রকৃত চালানে জমার পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৯৪ টাকা।
একইভাবে জি এম সাজ্জাদ হোসেনের নামে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ফেরত দেখাতে মাত্র ৩ হাজার ৬ টাকার একটি চালান এবং আক্তার হোসেনের নামে প্রায় ১২ লাখ টাকা ফেরত দেখাতে ১২ হাজার ১২২ টাকার একটি চালান ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত
এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২ সেপ্টেম্বর সিজিডিএফের অধীন সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান এবং ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের ইউজার আইডি ব্যবহার করে পেনশন ও ভাতার বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট অনুমোদন, বিল অনুমোদন এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) করা হয়েছে।
২৬ জন পেনশনভোগীর নামে মোট ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল তাঁদের ইউজার আইডির মাধ্যমে বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শাহীনুর রহমান আগে দাবি করেছিলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা উচিত।
তদন্তের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন
বকেয়া পেনশনের নামে এই জালিয়াতির ঘটনা তদন্তে ১৭ আগস্ট তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটি ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পেনশন বিবরণী, পরিশোধিত বকেয়া বিল এবং আইবাস প্লাস প্লাসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইউজার আইডিসহ বিভিন্ন নথি চেয়েছে।
তবে তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব এর আগে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৩ সালের পর থেকে সিসিডিএফ কার্যালয়ের পেনশন কার্যক্রম নিয়মিত অডিট হয়নি। ফলে ভুয়া ট্রেজারি চালানসহ বিভিন্ন অনিয়ম সময়মতো ধরা পড়েনি।
আইবাস ব্যবহার করে অন্যত্রও অনিয়ম
আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরানোর আরও একটি ঘটনা বগুড়ায় পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সরকারি চিঠিতে বলা হয়েছে, ছয় পুলিশ সদস্যের নামে ১৯৫টি ভ্রমণ ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা বিলের মাধ্যমে ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৬ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় অধিকাংশ বিলের মূল কপি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনলাইনে দাখিলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে বিলের কোড ও কর্মচারীর ধরন পরিবর্তন করে পরে বিল অনুমোদন এবং ইএফটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভুয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে তিনটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট সব লেনদেন এবং আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার পুরোনো রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নিজেদের অনুসন্ধান ও তদন্তেই যখন জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে, তখন বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তাঁর মতে, একই ধরনের একাধিক ঘটনা সামনে আসায় পুরো বিষয়টির আপাদমস্তক তদন্ত করা প্রয়োজন এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

0 মন্তব্যসমূহ