কিশোর গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই’ বদলেছে, বেড়েছে উৎপাত
চট্টগ্রামে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিশোর গ্যাংয়ের কথিত পৃষ্ঠপোষকতাতেও পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব কিশোর গ্যাং নেতা-কর্মী ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে ছিল, তাদের কেউ কেউ এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের বাকলিয়ার মো. মুরাদ এমনই একজন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গেছে। নিজের ফেসবুক পরিচয়ে মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মুরাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসায় কিশোর গ্যাং ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। গত রোববার বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর লোকজনের সঙ্গে একটি পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এর পরদিন নগর যুবদল বিবৃতি দিয়ে জানায়, মুরাদ তাদের সংগঠনের কেউ নন। এমদাদুল হকও তাঁকে নিজের অনুসারী হিসেবে অস্বীকার করেছেন।
মুরাদ একা নন। পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের কিছু নেতা ও সদস্য এখন বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ১১টি গ্যাংয়ের নাম বেশি এসেছে। এগুলো হলো মুরাদপুর এলাকার এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট), পাঁচলাইশের কেবি (খতিবের হাট), এনএস (নাজিরপাড়া), ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার।
গত সপ্তাহেও মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে নগরের দুটি এলাকায় কিশোর গ্যাংকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ফাইভ স্টার ও সেভেন স্টার গ্যাংয়ের বিরোধে ১৬ বছর বয়সী মো. হৃদয় নিহত হয়। সে তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করত।
পুলিশের হিসাবে, গত সাড়ে সাত বছরে চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ৬৩৫টি অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড রয়েছে ৩৯টি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, শুধু পুলিশের পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও গ্যাং সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকা উচিত।
পুরোনো গ্যাং, নতুন আশ্রয়
২০১৮ সালে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরের বছর পুলিশ ৪৮ জন কথিত পৃষ্ঠপোষকের একটি তালিকা তৈরি করে। স্থানীয়ভাবে তাঁরা ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের মার্চে তালিকায় আরও ১৬ জনের নাম যুক্ত করা হয়।
পুলিশের হিসাবে, এসব পৃষ্ঠপোষকের আশ্রয়ে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ সদস্য সক্রিয় ছিল। এরপর পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর হালনাগাদ করা হয়নি। তবে পুলিশের ধারণা, বর্তমানে গ্যাং ও সদস্য—দুইয়ের সংখ্যাই বেড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত তালিকাভুক্ত অনেক পৃষ্ঠপোষক আত্মগোপনে চলে যান। তবে তাঁদের আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের অনেক নেতা ও সদস্য এলাকায় থেকে যায়।
পুলিশ ও নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছেন।
নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিছু কিশোর গ্যাং নেতা ও সদস্য এখন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে থাকছেন। তাঁর মতে, এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদের সতর্ক করা হচ্ছে।
বেপরোয়া গ্যাং, আতঙ্কে মানুষ
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চট্টগ্রাম নগরে আলোচিত আরেক ব্যক্তি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ২৩টি মামলার এই আসামিকে গত ৮ জুন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাতে হৃদয় হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সেভেন স্টার গ্যাংয়ের সঙ্গে ওয়াকিলের যোগাযোগ রয়েছে।
ঘটনার পরদিন বুধবার এলাকায় গিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের কথা জানা যায়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ওয়াকিলের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের একটি বাহিনী রয়েছে—এমন ধারণা এলাকায় প্রচলিত। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে বা বিরোধে জড়ালে গ্যাংয়ের সদস্যরা হামলা বা হয়রানি করতে পারে বলে তাঁরা ভয় পান।
পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, তাঁর কলেজ ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ এলাকার অনেক মানুষ কিশোর গ্যাংয়ের কারণে সমস্যায় রয়েছেন এবং ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে চান না।
মিজানুর রহমান নিজেও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। গত ২৯ আগস্ট ওয়াকিলের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে তাঁকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ওয়াকিল ও তাঁর সহযোগীদের আসামি করে মামলা করেন তিনি।
ওয়াকিল পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ভাই রকি হোসেন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
মাদক ব্যবসায় কিশোরদের ব্যবহার
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ব্যবসার যোগসূত্রও বাড়ছে। মাদক বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখানো এবং পুলিশের অভিযানে বাধা দেওয়ার মতো কাজে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত আট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলার অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই ডবলমুরিংয়ের আমবাগানে মাদক মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। এ সময় ছুরিকাঘাতে এসআই মবিনুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। পুলিশের ওয়াকিটকিসহ কিছু সরঞ্জামও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরের শতাধিক মাদক বিক্রির স্থানে কোনো না কোনোভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, মাদকাসক্ত হওয়ার পর অনেকে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং পরে গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অপরাধ বাড়লেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায়
কিশোর গ্যাংয়ের নতুন অপরাধের পাশাপাশি পুরোনো মামলাগুলোর বিচারেও দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধসংক্রান্ত ১ হাজার ৬২৩টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাক্ষী হাজির না হওয়ায় অনেক মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না।
২০১৮ সালের আদনান ইসফার হত্যা মামলাটিও এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। মামলার ২৬ সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। সাত আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
এ ছাড়া গত বছর হালিশহরে কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বির হত্যা এবং চলতি বছরের এপ্রিলে চকবাজারে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ হত্যার মামলাও তদন্তাধীন রয়েছে।
সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শুধু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যারা এসব তরুণকে আশ্রয় দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’ বদলালেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ হবে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন