Subscribe Us

https://today24newsbangladesh.blogspot.com/

pop

Labels

Ads

ডেঙ্গুতে ৮ বছরের শিশুর মৃত্যু, অবস্থা খারাপ হওয়ার লক্ষণ বুঝতে পারেননি চিকিৎসক মা–বাবা

 



ডেঙ্গুতে ৮ বছরের শিশুর মৃত্যু, অবস্থা খারাপ হওয়ার লক্ষণ বুঝতে পারেননি চিকিৎসক মা–বাবা

ডেঙ্গু নিয়ে রোগীদের পরামর্শ দেওয়ার সময় চিকিৎসক মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান সাধারণত পেটে ব্যথা, রক্তবমি কিংবা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো সতর্কতামূলক লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখতে বলতেন। কিন্তু তাঁর নিজের ৮ বছর বয়সী মেয়ে ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার ক্ষেত্রে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছে—এটা বুঝে ওঠার আগেই মারা যায় শিশুটি।

ফামইয়া মাশনুরের বয়স হয়েছিল ৮ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখার ইংলিশ ভার্সনে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে।

২৯ সেপ্টেম্বর সকালে তার জ্বর বেড়ে যায়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয় মঙ্গলবার। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ১ অক্টোবর বিকেলে মারা যায় ফামইয়া।

তার বাবা মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ। মা ফারজানা সুলতানা রাজধানীর ভিশন আই হাসপাতালে চক্ষুবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।

ফামইয়া ছিল এই চিকিৎসক দম্পতির বড় মেয়ে। আগামী ১৭ নভেম্বর তার জন্মদিন উপলক্ষে কক্সবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল পরিবারের। কেক কাটা, মা–বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে সময় কাটানো—এসব নিয়ে অনেক আগেই পরিকল্পনা করেছিল সে। এমনকি জন্মদিনে মায়ের সঙ্গে পরবে বলে নিজের ও ছোট বোনের জন্য নতুন পোশাকও কিনেছিল।

মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, মেয়ের ডেঙ্গু পরীক্ষায় পজিটিভ আসার পরও তার অবস্থা খারাপ হওয়ার মতো কোনো স্পষ্ট লক্ষণ তাঁরা দেখতে পাননি।

তিনি বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পরও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মেয়েটি মারা যায়। স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পর পিআইসিইউতে আধা ঘণ্টাও থাকতে পারেনি সে।

জ্বর থেকে দ্রুত অবনতি

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ফামইয়া শরীরে জ্বর জ্বর ভাবের কথা জানায়। পরদিন সকালে জ্বর বেড়ে গেলে সে স্কুলে যেতে পারেনি। মঙ্গলবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলে ফল পজিটিভ আসে।

বাসায় ক্যানুলা করে তাকে স্যালাইন দেওয়া হয়। এ সময় বাবা জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় বুধবার কোনো পরীক্ষা করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার ফামইয়া শারীরিকভাবে আরও খারাপ বোধ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে তার খিঁচুনি হয়। তাকে দ্রুত বনশ্রীর একটি স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা পিআইসিইউ না থাকায় অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

শেষ পর্যন্ত স্কয়ার হাসপাতালে পিআইসিইউ পাওয়া যায়। কিন্তু যানজটের কারণে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে। এর মধ্যেই শিশুটির অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে তার নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে।

এর আগে পর্যন্ত সে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিল। এমনকি দাদির পাঠানো ডাবও খেয়েছিল।

ছোট বোন বুঝতে পারছে না বোন কোথায়

ফামইয়ার ছোট বোন ফারজিন মাহনুর ওয়ারিসার বয়স ৫ বছর ৮ মাস। দুই বোনের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সারাক্ষণ একসঙ্গে খেলাধুলা ও খুনসুটিতে মেতে থাকত তারা। বড় বোনই ছোট বোনকে গোসল করিয়ে দিত।

এখনও ফারজিন বুঝতে পারছে না, তার বোন কোথায় চলে গেছে। সে বড় বোনকে ‘ইয়া’ বলে ডাকত। পরিবার তাকে জানিয়েছে, ইয়া আল্লাহর কাছে চলে গেছে। শিশুটি নিজের মতো করে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে।

ঘরজুড়ে এখন শুধু মেয়ের স্মৃতি

মা ফারজানা সুলতানা ঘরের প্রতিটি জায়গায় মেয়ের স্মৃতি খুঁজে ফিরছেন। ফামইয়া জিনিসপত্র যত্ন করে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করত। কোনো কিছু সহজে ফেলে দিতে চাইত না।

এখন সেই ঘরেই ছড়িয়ে আছে তার ব্যবহার করা জিনিস, পোশাক এবং নানা স্মৃতি। মেয়েটিও যেন পরিবারের কাছে এখন এক স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

মা–বাবা নিজেদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, হয়তো এটাই তাদের মেয়ের ভাগ্যে লেখা ছিল এবং তার আয়ু এতটুকুই ছিল। কিন্তু নানা ছোট ছোট স্মৃতি বারবার তাঁদের কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মৃত্যুর আগের দিন ফামইয়া আমের জুস খেতে চেয়েছিল, কিন্তু খেতে পারেনি। জন্মদিনের জন্য কেনা নতুন পোশাকও এখনো আলমারিতে পড়ে আছে।

গত বছর এই সময় পুরো পরিবার একসঙ্গে হজে গিয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে সাজেক ভ্রমণের সময় মা–বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে তোলা ফামইয়ার শেষ সেলফিটিও এখন পরিবারের কাছে বিশেষ স্মৃতি হয়ে আছে।

‘মেয়েটা খুব সংবেদনশীল ছিল’

বাবা ওমর ফারুক জানান, ফামইয়া ছিল খুব সংবেদনশীল স্বভাবের শিশু। একবার অসুস্থ অবস্থায় বমি করার পর বাসার এক সহায়তাকারীর সামনে জামা পরিবর্তন করায় সে মাকে জানিয়েছিল, ওই নারীর সামনে পোশাক বদলাতে তার লজ্জা লাগছে।

মেয়ের ডেঙ্গু হওয়ার আগে তার মায়েরও ডেঙ্গু হয়েছিল। বাসায় ক্যানুলা করে স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মেয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং কোনো ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাবার আক্ষেপ

মুহাম্মদ ওমর ফারুক মনে করেন, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পিআইসিইউ সুবিধা থাকা, সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত।

তিনি জানান, বনশ্রীতে তাঁদের বাসার কাছেই একটি ময়লার ভাগাড় রয়েছে, যেখানে প্রায়ই পানি জমে থাকে। এসব জায়গায় মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

মেয়েকে পড়াশোনা নিয়েও কখনো অতিরিক্ত চাপ দিতেন না বলে জানান এই বাবা। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে কাজ করার কারণে পোড়া শিশুদের কষ্ট কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাই মেয়ে রান্নাঘরে গেলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সব সময় সতর্ক থাকতেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মেয়ের জীবন থেমে গেল মাত্র একটি মশার কামড় থেকে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গুতে। এই ঘটনাই এখন পরিবারটির কাছে সবচেয়ে বড় শোক ও আক্ষেপ হয়ে আছে।

কোন মন্তব্য নেই: