পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষের পর পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ একাধিক শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে।
শুক্রবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেন, আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে এবং দেশটি এখন কার্যত ‘যুদ্ধাবস্থায়’ প্রবেশ করছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন, বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
কীভাবে পরিস্থিতির অবনতি হলো
পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, আফগান বাহিনী সীমান্তঘেঁষা তাদের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা শুরু করে। পাকিস্তান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারে তালেবান সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলা হয়েছে। আফগান পক্ষও এসব স্থানে হামলার কথা স্বীকার করেছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, তালেবানের একাধিক ঘাঁটি ও অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে তোরখাম সীমান্ত এলাকা ও অন্যান্য সেক্টরেও গোলাগুলি ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অক্টোবর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণে স্থলসীমান্ত আংশিক বন্ধ রয়েছে।
হতাহতের বিপরীতমুখী দাবি
দুই পক্ষের দেওয়া হতাহতের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তাদের অভিযানে শতাধিক আফগান তালেবান সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন এবং বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে তালেবান সরকার বলছে, তাদের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত।
আফগানিস্তান পাল্টা দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানি সেনাদের হতাহত করেছে এবং সীমান্তের কয়েকটি ঘাঁটি দখলে নিয়েছে। পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
উত্তেজনার পেছনের কারণ
এই সংঘাতের মূল শিকড় বহু পুরোনো। দুই দেশের ২,৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, যা ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত, আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের মতে, এটি ঔপনিবেশিক আমলের একটি বিভাজন, যা পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে বিভক্ত করেছে।
২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগান ভূখণ্ডে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার বা গুরুত্বহীন বলে উল্লেখ করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক। কারণ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আদর্শিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছে, অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে টিটিপির সদস্যরা আইএসকেপির মতো প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গি গোষ্ঠীতে যোগ দিতে পারে।
এটি কি অনিবার্য ছিল?
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, গত কয়েক মাসের উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় এই বিস্ফোরণ একপ্রকার অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানের ভেতরে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।
তবে কূটনৈতিক মহল বলছে, সংলাপ ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়নি। অতীতে কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছিল। এবারও আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক উদ্যোগ পরিস্থিতি শান্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ভারত, জাতিসংঘ, ইরান ও রাশিয়া—সব পক্ষই সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে সংঘাত বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান সংঘাত তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধ, আস্থাহীনতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে পারস্পরিক অভিযোগ। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি আরও বড় আকারের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ