১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

 


১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু

আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এগোচ্ছে সরকার।

কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো তিন অর্থবছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই অর্থবছরে নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে দেওয়া হবে এবং তৃতীয় অর্থবছরে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কার্যকর হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।

সচিবালয়ে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি সেখানে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

যদিও বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং হয়নি, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সোমবার বলেন, আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে এবং এটি কীভাবে সর্বোত্তমভাবে করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।

যেভাবে বাড়বে বেতন

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, বর্তমানে একজন সরকারি কর্মকর্তা ৫০ হাজার টাকা মূল বেতন পান। নতুন কাঠামোয় তাঁর মূল বেতন হবে ১ লাখ টাকা। তবে প্রথম বছরেই তিনি পুরো ১ লাখ টাকা পাবেন না।

প্রথম ধাপে বর্তমান বেতন ও নতুন বেতনের পার্থক্যের ৫০ শতাংশ যোগ হবে। অর্থাৎ, ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা যোগ হয়ে তিনি প্রথম বছরে ৭৫ হাজার টাকা মূল বেতন পাবেন। অন্যান্য ভাতা ও সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকবে।

দ্বিতীয় বছরের জুলাই থেকে তিনি পূর্ণ ১ লাখ টাকা মূল বেতন পাবেন। তৃতীয় বছরের জুলাই থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে।

বেতন কমিশনের সুপারিশ

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের জন্য সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পর গত ২৩ এপ্রিল নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিই তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।

প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক সম্মতির পর আগামী ২১ মে আবার বৈঠকে বসছে নাসিমুল গনির কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেখানেই বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সরকারের ব্যয় বাড়বে

বেতন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে আগামী অর্থবছরে নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের বাজেট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় এবং অর্থনীতি চাপে রয়েছে। তাই বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমাতে হলেও নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে।

১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ

নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে।

কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য আলাদা বিশেষ ধাপ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

ভাতা ও সুবিধাও বাড়বে

মূল বেতন বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতার পরিমাণও বাড়বে। বর্তমানে বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হলেও তা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পান। নতুন প্রস্তাবে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত এ সুবিধা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।

পেনশনভোগীরাও পাবেন বাড়তি সুবিধা

নতুন প্রস্তাবে পেনশনভোগীদের সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

1. যাঁরা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাঁদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

2. ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হতে পারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত।৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৫৫ শতাংশ।

এ ছাড়া বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—

3. ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা,

4. ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা,

5. এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা।

বিশেষজ্ঞদের মত

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর চিন্তা বাস্তবসম্মত। তবে তিনি মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না, সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ