কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী শনাক্তে পশ্চিমবঙ্গে অভিযান, মুসলিমদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কথিত নথিপত্রহীন বাংলাদেশি অভিবাসীদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর অভিযানে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজ্যের একাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে, এই অভিযানের আওতায় ভুলবশত বা বৈষম্যমূলকভাবে তারাও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্তঘেঁষা হাকিমপুরে তীব্র গরমের মধ্যে অপেক্ষা করছেন সাতক্ষীরার বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী রেবেকা খাতুন এবং দুই ছেলে। তাঁদের মতো আরও অনেককে সেখানে জড়ো করা হয়েছে, যাদের ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার কথিত অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, বাদ ও বহিষ্কার) কর্মসূচি শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে সীমান্ত এলাকায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপন এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে শ্রমিকদের যাতায়াত, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও পারিবারিক যোগাযোগ বিদ্যমান। তবে বিজেপি সরকার দাবি করছে, পশ্চিমবঙ্গে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী অবস্থান করছেন এবং তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
উন্নত জীবিকার আশায় সীমান্ত পেরোনো
রাইসুল ইসলামের দাবি, দুই বছর আগে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি পরিবারসহ ভারতে যান। পরে সেখানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে তুলনামূলক বেশি আয় হওয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যা আয় করতাম, তার চেয়ে ভারতে বেশি মজুরি পাওয়া যেত। তাই সেখানেই কাজ করছিলাম।”
তবে নতুন সরকারের অভিযানের কারণে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানান। তাঁর ভাষায়, স্থানীয়দের হয়রানি ও পুলিশের অভিযানের আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেকে। তাঁদের দাবি, অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব তাদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য করেছে।
ব্যাপক ধরপাকড় ও আটককেন্দ্র
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে হাজারো ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। কাউকে আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, আবার কাউকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
হাকিমপুরে দায়িত্ব পালনকারী এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রতিদিন কয়েকশ’ মানুষ সেখানে আসছেন। তাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি দাবি করেছেন, কয়েক হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে ইতোমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও শত শত ব্যক্তি আটককেন্দ্রে রয়েছেন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
বাংলাদেশ সরকার বলছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।
ঢাকার পক্ষ থেকে একাধিকবার নয়াদিল্লিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তাঁর বক্তব্য, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে একাধিক ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।
এ বিষয়টি নিয়ে বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সাম্প্রতিক বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বিজিবি সীমান্তে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এই পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বৈধ নথিপত্র না থাকলেও আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করলে ভারতীয় নাগরিকরাও ভুলভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সমালোচকদের মতে, কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এই অভিযান পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলছে। রাজ্যটির প্রায় ২৭ শতাংশ বাসিন্দা মুসলিম এবং তাদের একটি অংশের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, অভিযানের প্রভাব তাদের ওপরও পড়তে পারে।
অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা
হাকিমপুর সীমান্তে দিনশেষে রাইসুল ইসলাম তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল সন্তানদের জন্য ভালো জীবিকার ব্যবস্থা করা।
কিছুক্ষণ পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁর পরিবারকে একটি গাড়িতে তুলে নিকটবর্তী একটি আটককেন্দ্রে নিয়ে যায়। এরপর তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

0 মন্তব্যসমূহ