টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর আজ শনিবার কিছুটা স্বস্তির শ্বাস নেওয়া যেতে পারে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের টার্মিনালসমূহ—সামিট এবং এক্সিলারেট—আংশিকভাবে চালু হয়েছে। এর ফলে আজ ভোর থেকে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। তবে পুরো সংকট কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনের পর পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানি তদারকি করে, আর আমদানির কাজটি করে পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত দুই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, আজ ভোর চারটায় সামিট টার্মিনাল থেকে ৪৬ কোটি ঘনফুট ও এক্সিলারেট থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, বর্তমানে দুটি টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। সামিট টার্মিনাল পূর্ণক্ষমতায় কাজ করছে, আর এক্সিলারেট টার্মিনাল আংশিক সরবরাহ করছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে গ্রাহকরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে—মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটির সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় কোম্পানি সামিট টার্মিনালের ৫০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা সংকট বাড়িয়ে দেয়। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ কম দেওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। সিএনজিচালিত যানবাহনে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি পড়ে।
পেট্রোবাংলার সূত্রে জানা গেছে, এক্সিলারেট টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে, প্রতিটির সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি বয়লার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর অপরটি থেকে ৬ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। গতকাল বিকেলে কারিগরি সমস্যার কারণে কিছুক্ষণ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও পরে পুনরায় চালু হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো চালু করা যায়নি, চালুর জন্য কাজ চলছে। চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, যা ৭২ ঘণ্টা স্থায়ী হবে। এই বিষয়ে আলোচনা চলছে, নির্দিষ্ট সময় এখনও ঠিক হয়নি।
এদিকে, গত সোমবার এলএনজি না পাওয়ায় সামিটের সরবরাহ কমানো হয়। মঙ্গলবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ১০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়। শুক্রবার বিকেলে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায় ভিটলের একটি এলএনজি জাহাজ, যা সন্ধ্যা ৭টায় সামিট টার্মিনালে এলএনজি খালাস শুরু করে। খালাসে আট ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টা থেকে টার্মিনালের মজুত থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রথমে সাড়ে ৯ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়, যা ভোররাতে ৪৬ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়। আরও ৭-৮ কোটি ঘনফুট বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে বঙ্গোপসাগরে আসা সৌদি আরামকোর এলএনজি জাহাজটি ফেরত পাঠানো হয়, কারণ জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সামঞ্জস্যতা ছিল না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রের বেয়ারী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি নেওয়া যায়নি। আরামকো একটি নতুন জাহাজ পাঠাবে। ভিটল এশিয়ার নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়ায় কোনো সমস্যা হয়নি।
দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ থাকলে সব খাতে গ্যাস চলে। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট রেশনিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে এলএনজি থেকে আসে ১০৫ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেট বন্ধের আগে এই পরিমাণ সরবরাহ হতো। গতকাল বিকেলে মোট সরবরাহ ছিল ১৭৩ কোটি ঘনফুট, যা এখন প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় এখনও ৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। এক্সিলারেট টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে ঘাটতি পূরণ হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তাত্ক্ষণিক সমাধান নেই, প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। বৃষ্টি ও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে দুই দিন বিদ্যুতের চাহিদা কমে লোডশেডিং কমেছে। গরম বাড়লে বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং আবার বাড়তে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ