হরমুজ প্রণালি কি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে পারে, ট্রাম্পের হুমকি কতটা বাস্তব

 

হরমুজ প্রণালি কি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে পারে, ট্রাম্পের হুমকি কতটা বাস্তব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শীঘ্রই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করবেন। ইতিহাসে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। এখন এই প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইরান ট্রাম্পের এই হুমকিকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে গত জুনে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হয়েছে, আর উত্তেজনা বাড়ছে। ইরান এই জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাহত করার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখছে এবং তা বন্ধ রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যা ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে ‘দাবার লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গত বেশ কয়েক মাসে তিনি মাঝে মাঝে আক্রমণাত্মক হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সেগুলো থেকে সরে এসেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলেই কি হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের অংশ করতে পারে? এবং এর অর্থ কী?

ট্রাম্পের বক্তব্য:
নিউইয়র্কে এক পুলিশ একাডেমিতে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান পরাজিত হচ্ছে, শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করব।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমাদের নৌ অবরোধের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের অংশে পরিণত হয়েছে, কারণ আমরা চাইলে কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।’

ইরানের প্রতিক্রিয়া:
ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি ট্রাম্পকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানকে ছোট করার ভুল করবেন না, তাদের যোদ্ধারা প্রয়োজনে ট্রাম্পের ‘পা ভেঙে দেবে’। বিচার বিভাগের প্রধান ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ ও ‘নির্বোধ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁর বক্তব্যকে ‘বাজে কথা’ বলেছেন। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের অধীনেই থাকবে এবং এটি কেবল ইরানের অনুমতিতেই খোলা বা বন্ধ হবে।

ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা করছে এবং শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আশা করা হচ্ছে। তবে জলপথ পুনরায় খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।

আইনি ও বাস্তবতা:
শুধুমাত্র ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণার মাধ্যমে কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব পরিবর্তন সম্ভব নয়। মার্কিন সংবিধানের বিধি অনুযায়ী, কোনো অঞ্চল দখলে নিতে হলে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনে, যদি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করে, তাহলে এই দাবি বাস্তবায়ন করা কঠিন।

সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধে সমর্থন জানায় না। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সামরিক সরঞ্জামের সংকট দেশটিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতা:
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপকূলীয় দেশগুলোর জলসীমার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে, তবে উক্ত জলসীমার মধ্য দিয়ে যেকোনো দেশের জাহাজ চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করেনি, কিন্তু আইনটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের হুমকি মূলত তার ভোটার ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এবং বাস্তবে এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি এই বক্তব্যে প্রমাণ করেছেন যে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ