পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’, বাদ পড়ছে টুঙ্গিপাড়ার সমাধিসৌধ

 


পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’, বাদ পড়ছে টুঙ্গিপাড়ার সমাধিসৌধ

বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও যুক্ত করা হচ্ছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ। ছয় বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাদ দেওয়া এই শর্ত পুনর্বহাল করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ পুনর্বহালের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো সেই চিঠিতে আগের মতো বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ পুনরায় যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক পাসপোর্টের বাইরে বড় পরিসরে কার্যকর হয়নি। এখন বর্তমান সরকার সব ধরনের পাসপোর্টে এটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার পাসপোর্টে একাধিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করে। এ বিষয়ে এপ্রিল ও চলতি মাসের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিবর্তনগুলোতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট চালু করা হয়। তখনই পাসপোর্ট থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ বাদ দেওয়া হয়। এর আগে বাংলাদেশি পাসপোর্টে উল্লেখ থাকত—এই পাসপোর্ট ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।

এরপর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে ই-পাসপোর্টে আবারও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত যুক্ত করার দাবি উঠতে থাকে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন পাসপোর্টে এই শব্দবন্ধ যুক্ত করা হবে। পুরোনো পাসপোর্টধারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। মেয়াদ শেষে নবায়নের সময় তাঁরা নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট পাবেন।

পাসপোর্ট থেকে বাদ যাচ্ছে যেসব ছবি

বর্তমান ই-পাসপোর্টের প্রতিটি পাতায় জলছাপ হিসেবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রতীকের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি, স্থাপনা ও ব্যক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ছবি বাদ দেওয়া হবে এবং নতুন কিছু ছবি যুক্ত করা হবে। চলতি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পাসপোর্ট থেকে বাদ যাচ্ছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতার স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, নৌকাসহ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ছবি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির এবং মেহেরপুরে মুজিবনগর সরকারের স্মৃতিসৌধের ছবি।

অন্যদিকে নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি।

এ ছাড়া নতুন পাসপোর্টে স্থান পাচ্ছে ঐতিহাসিক বঙ্গভবন, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, নৌকাবিহীন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, ঢাকার আহসান মঞ্জিল, কুমিল্লার শালবন বিহার, বান্দরবানের নীলগিরি পর্বত, রাজশাহীর আমবাগান, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর ছবি।

আগের যেসব ছবি অপরিবর্তিত থাকছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা, বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা অনির্বাণ, লালবাগ কেল্লা, হাতিরঝিল, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, কার্জন হল, ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনালি আঁশ পাট, চা–বাগান, সুন্দরবন এবং জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বুধবার বিকেলে তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, পাসপোর্টের ভেতরে থাকা কয়েকটি জলছাপ বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন কিছু ছবি যুক্ত করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের অনুমোদন পাওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ই-পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত পুনর্বহাল এবং জলছাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীকী বিষয়গুলো নতুনভাবে বিন্যাস করার পথে এগোচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ