ইরান যুদ্ধ, অস্ত্রের মজুত ও তেলের দাম নিয়ে ট্রাম্পের দাবি কতটা সত্য?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরান যুদ্ধকে ঘিরে সামরিক সক্ষমতা, অস্ত্রের মজুত, তেলের দাম এবং যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেছেন। তবে বিভিন্ন সরকারি তথ্য, সামরিক বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে তাঁর কয়েকটি বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অমিল পাওয়া গেছে।
ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ায় কি যুক্তরাষ্ট্রের মজুত কমেছে?
ট্রাম্প দাবি করেন, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের কাজ চলছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে।
বাস্তবে, ইউক্রেনকে ব্যাপক সামরিক সহায়তা দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমেছিল। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইরান যুদ্ধে যেসব অস্ত্র সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশই ইউক্রেনে পাঠানো স্থলযুদ্ধের সরঞ্জামের সঙ্গে এক নয়।
ইউক্রেনে যেসব অস্ত্র পাঠানো হয়েছিল
বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে মূলত পাঠিয়েছিল—
ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, সামরিক ট্রাক, জ্যাভলিন ও টো অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র, মর্টার ও কামান, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ. অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভরসা দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌ ও বিমানবাহিনীর উন্নত অস্ত্র।
কোন অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যবহার করেছে—
প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, জেএএসএসএম দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল, এসএম-৩ ও এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র, থাড (THAAD) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উন্নত অস্ত্রের অধিকাংশই ইউক্রেনে সরবরাহ করা হয়নি। ফলে বর্তমান সংকটকে পুরোপুরি ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তার ফল বলা যথাযথ নয়।
তবে ইউক্রেনে পাঠানো স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্র, জ্যাভলিন এবং ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা পরবর্তীতে নতুন উৎপাদনের মাধ্যমে পুনরায় মজুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তেলের দাম কি সত্যিই অনেক কমেছে?
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যুদ্ধের মধ্যেই তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে একদিনে তেলের দাম বড় ধরনের পতন হয়েছিল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলারে নেমে আসে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দামও ৭ শতাংশের বেশি কমেছিল।
তবে সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন।
যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পতনের পরও তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফা দাম ৯০ থেকে ১০০ ডলারেরও ওপরে উঠেছিল।
হতাহতের তুলনায় কী বাদ পড়েছে?
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চার্ট প্রকাশ করে ইরান যুদ্ধের হতাহতের সংখ্যা ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন।
ঐতিহাসিকভাবে বড় যুদ্ধগুলোর মোট নিহতের সংখ্যা সঠিকের কাছাকাছি হলেও বিশ্লেষকদের মতে, তুলনাটি পুরোপুরি সমতুল্য নয়।
কারণ— ইরান সংঘাত এখনো সীমিত সময়ের একটি সামরিক অভিযান।, অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ কয়েক বছর থেকে কয়েক দশক ধরে চলেছে।, ট্রাম্পের প্রকাশিত তথ্যে তাঁর মেয়াদে পরিচালিত অন্যান্য সামরিক অভিযানের হতাহতদের উল্লেখ করা হয়নি।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ৬০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতে নিহতের পাশাপাশি কয়েক শতাধিক মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যা হতাহতের সামগ্রিক চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আলোচনায় কম উঠে এসেছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছু বাস্তব তথ্য থাকলেও তা সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরে না।
ইউক্রেনে বিপুল অস্ত্র সহায়তা দেওয়া হয়েছিল—এটি সত্য।, তবে বর্তমান ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত উন্নত অস্ত্রের সংকটকে শুধু ইউক্রেনকে দায়ী করা সঠিক নয়।, তেলের দাম একদিন কমলেও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো বেশি রয়েছে।. হতাহতের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও সীমিত সামরিক অভিযানের মধ্যে সরাসরি তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র আড়াল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের প্রকৃত সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের জন্য বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যানের পরিবর্তে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

0 মন্তব্যসমূহ