টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান BSTI-এর
দেশে বিক্রি হওয়া কয়েকটি টুথপেস্ট ব্র্যান্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর প্রকাশের পর জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)। সংস্থাটি বলেছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো পণ্যকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের ঘোষণা করা যাবে না।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে BSTI জানায়, দেশের বাজার ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ এবং বিদেশের স্বীকৃত পরীক্ষাগারে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষায় যদি কোনো পণ্যে জাতীয় মান লঙ্ঘন বা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO)-এর এক গবেষণায় পরীক্ষাধীন ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির দাবি করা হয়। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
BSTI জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা, যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না।
BSTI আরও জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) মাইক্রোপ্লাস্টিককে একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। তবে এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা এখনও চলমান এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা
BSTI জানায়, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ভোক্তা পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে Microbead-Free Waters Act প্রণয়নের মাধ্যমে টুথপেস্টসহ ধুয়ে ফেলা হয় এমন প্রসাধনীতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা প্রথম দেশ।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণভাবে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া আরও অনেক দেশ টুথপেস্টে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
তবে BSTI উল্লেখ করেছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ কয়েকটি দেশের প্রচলিত টুথপেস্ট মানদণ্ড এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ বা এর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করার বিধান নেই।
সংস্থাটি আরও জানায়, টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে উপস্থিত মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিমাপের জন্য বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো মানসম্মত পরীক্ষাপদ্ধতি বা নিরাপদ সীমাও নির্ধারিত হয়নি।
জাতীয় মান পর্যালোচনা করছে BSTI
BSTI জানিয়েছে, বাংলাদেশে টুথপেস্ট উৎপাদনের জন্য একটি জাতীয় মান বিদ্যমান। যদিও সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ নেই, তবে টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত ৮১টি উপাদানের তালিকা রয়েছে এবং সেই তালিকায় প্লাস্টিক মাইক্রোবিড অন্তর্ভুক্ত নয়।
সংস্থাটি জানায়, কোনো প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে সনদ দেওয়ার আগে তাদের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে পরিদর্শন করা হয়। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের সুযোগ নেই।
BSTI সতর্ক করে বলেছে, কোনো পণ্যে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হওয়া মানেই প্রস্তুতকারক ইচ্ছাকৃতভাবে তা ব্যবহার করেছে বা পণ্যটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এ জন্য কণার ধরন, উৎস, ঘনত্ব এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তদন্তের অংশ হিসেবে BSTI ইতোমধ্যে ESDO-এর কাছে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন, পরীক্ষার পদ্ধতি, কাঁচা তথ্য (Raw Data) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথি চেয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিন্থেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দন্ত চিকিৎসক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি এবং ভোক্তা সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করে দেশের টুথপেস্টের জাতীয় মানদণ্ডের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা শুরু করেছে BSTI।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় মানদণ্ড হালনাগাদ করা হবে। এতে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, উপাদান প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত পরীক্ষাপদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন