কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত, নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সহায়তার আহ্বান
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। শুক্রবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন আশ্রয়শিবির ঘুরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
সফরে তার সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অন্যতম বৃহৎ দাতা। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি ও কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যালোচনা করা। প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে পুরো আশ্রয়শিবিরের পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করে।
তিনি জানান, সফরকালে রোহিঙ্গারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কাছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। তারা দ্রুত নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।
পরিদর্শন শেষে বিকেলে প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে আরআরআরসির কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠকে অংশ নেয়।
বৈঠকে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানতে চান, এখনো নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন কি না, বাংলাদেশ থেকে কেউ মিয়ানমারে ফিরে যাচ্ছেন কি না, রাখাইন রাজ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক কী অবস্থায় রয়েছে।
জবাবে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, নির্যাতন ও চিকিৎসার প্রয়োজনের কারণে এখনো প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ১০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এবং কিছু রোহিঙ্গার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষও বেড়েছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। বরং গত দেড় বছরে রাখাইন রাজ্যের নতুন সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
স্বাস্থ্য, খাদ্য ও নিবন্ধন কার্যক্রম পরিদর্শন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিনিধিদল উখিয়ার ক্যাম্প-৪, ক্যাম্প-৬ এবং ক্যাম্প-৮ (ওয়েস্ট) এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য বিতরণ, তথ্য নিবন্ধন এবং এলপিজি বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করে।
ক্যাম্প-৬-এর একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তারা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি কর্মসূচি, জরুরি চিকিৎসা, ওষুধের সরবরাহ এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এ ছাড়া ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় পরিচালিত ডেটা নিবন্ধন কেন্দ্র, নতুন আগত রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রম, আইওএমের অর্থায়নে এলপিজি বিতরণ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ই-ভাউচারভিত্তিক খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থাও তারা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনের সময় ক্যাম্প-৪ এলাকায় কয়েকশ রোহিঙ্গা প্ল্যাকার্ড হাতে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। তারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান।

0 মন্তব্যসমূহ