শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি


 

শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

মূল তথ্য

১. রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন।
২. পদত্যাগের কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হতে পারে।
৩. বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতোমধ্যে তাকে পদত্যাগের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি।
৪. সরকার ও ক্ষমতাসীন দল সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা করছে।
৫. রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
৬. সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে।


রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন অচিরেই পদত্যাগ করতে পারেন। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, তার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করা হতে পারে।

সরকার ও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা ইতোমধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে দল ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্র বুধবার রাতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, খুব শিগগিরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা প্রবল।

একই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা নিয়েও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানের নাম আলোচনায় থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন—তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

তিনি বলেন, "আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের নাম আলোচনায় আসবে।"

বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়ে বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

তবে বঙ্গভবনের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি অনানুষ্ঠানিকভাবে তার দপ্তরের কর্মকর্তাদের দ্রুত বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

সংবিধানে যা বলা আছে

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত লিখিত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন।

৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা অসুস্থতা, অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা

আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হওয়ায় তার সম্ভাবনা বেড়েছে।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকার ও দলীয় পর্যায়ে আরও আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকালে সাংবিধানিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন—এমন একজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শাহাবুদ্দিন

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন। এ সময় সংসদ বিলুপ্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রনেতারা তার পদত্যাগ দাবি করেন। বিভিন্ন সংগঠন বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের কোনো সাংবিধানিক উদ্যোগ নেয়নি।

পরে বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। তবুও সরকার গঠনের পরপরই বিএনপি তাকে অপসারণ বা পদত্যাগের জন্য প্রকাশ্যে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অতীতের বিতর্ক

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তার নিয়োগ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল।

তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় দুটি প্রতিষ্ঠানই আলোচিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার পর তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার সম্মতিতেই তাকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। সমালোচকদের একটি অংশ তার সঙ্গে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও সামনে এনেছিল।

রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রথমদিকে রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছায় পদত্যাগের অপেক্ষায় ছিল। সম্প্রতি দলটির অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথমবারের মতো নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে বিএনপি।

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ বিরাজ করছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ