র‍্যাপার প্রধানমন্ত্রী ও জেন–জি সরকারের দুই মাস: বাড়ছে প্রশ্ন, বাড়ছে অস্বস্তি

 

র‍্যাপার প্রধানমন্ত্রী ও জেন–জি সরকারের দুই মাস: বাড়ছে প্রশ্ন, বাড়ছে অস্বস্তি

নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ একসময় জনপ্রিয় র‍্যাপার ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গান ‘ম নেপালও হাসেকো হের্ন চাহাচ্ছু’—অর্থাৎ ‘আমি দেখতে চাই নেপাল হেসে উঠুক’—তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সেই জনপ্রিয়তার জোরে তিনি প্রথমে কাঠমান্ডুর মেয়র এবং পরে জেন–জি তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।

তবে ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায় তাঁর সরকারকে ঘিরে প্রশ্ন ও সমালোচনা বাড়তে শুরু করেছে। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়—সব জায়গাতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন বালেন শাহ ও তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ড।

সংসদে অনাগ্রহী প্রধানমন্ত্রী

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংসদে বালেন শাহর উপস্থিতি খুবই সীমিত। নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির বিরল যে একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেও সংসদে উল্লেখযোগ্য কোনো বক্তব্য দেননি।

দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সমালোচকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর জনগণ ও সংসদের কাছে জবাবদিহি করা প্রয়োজন, কিন্তু বালেন শাহ সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, সংসদে উপস্থিত হলেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন না। তাঁর পরিবর্তে অনেক সময় মন্ত্রীরা জবাব দেন। ফলে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, সরকার ধীরে ধীরে সংসদীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়কৃত শাসনব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

গত দুই মাসে সরকারের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

এর মধ্যে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচিত। সমালোচকদের মতে, এতে ক্ষমতা অতিরিক্তভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

একই সময়ে কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো উচ্ছেদে বুলডোজার ব্যবহারের সিদ্ধান্তও ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই দরিদ্র মানুষকে উচ্ছেদ করা অমানবিক।

অক্সফামের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কেন্দ্রীভূত, আর নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে ৫ শতাংশেরও কম সম্পদ। এমন বৈষম্যের বাস্তবতায় সরকারের উচ্ছেদ অভিযান আরও সমালোচিত হচ্ছে।

বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘাত

বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি হলো প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।

জ্যেষ্ঠতার প্রথা উপেক্ষা করে বালেন শাহ সরকার মনোজ কুমার শর্মাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছে। এতে বিচার বিভাগ ও আইনজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিরোধীরা বলছে, এই নিয়োগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতের ভেতরেও বিচারপতিদের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের ইউনিয়ন গঠন এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্তও আদালত স্থগিত করেছে। আদালতের মতে, এসব সিদ্ধান্ত বিদ্যমান আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সীমান্তনীতি নিয়ে অসন্তোষ

সরকার সম্প্রতি সীমান্তপথে আনা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তও আদালত স্থগিত করে দিয়েছেন।

বিশেষ করে ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী মধেস অঞ্চলে এর প্রভাব ব্যাপক ছিল। বহু মানুষ প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাজার করেন এবং প্রয়োজনীয় পণ্য আনেন। নতুন নীতির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও মনে করছেন, সীমান্তবর্তী জনগণের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

নিজের দলেও বাড়ছে দূরত্ব

বালেন শাহকে সামনে রেখেই রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু এখন দলের ভেতরেও অস্বস্তি বাড়ছে।

দলীয় নেতাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত দলীয় বৈঠকে অংশ নেন না এবং অনেক নেতাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নির্বাচনে পাওয়া বিপুল জনসমর্থন মূলত তরুণদের আন্দোলন ও বালেনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার লক্ষণ দেখা দিলে দলের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

চীন ও ভারতের উদ্বেগ

পররাষ্ট্রনীতিতেও নতুন সরকারকে ঘিরে কৌতূহল ও উদ্বেগ রয়েছে।

নির্বাচনের আগে বালেন শাহর দল বলেছিল, নেপাল আর চীন ও ভারতের মধ্যে একটি ‘বাফার রাষ্ট্র’ হয়ে থাকতে চায় না; বরং ‘সংযোগকারী রাষ্ট্র’ হতে চায়। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে তিব্বতি শরণার্থী ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সক্রিয়তা চীনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বেইজিংয়ের ধারণা, নতুন সরকারের কিছু অংশ নেপালে চীনবিরোধী জনমত তৈরিতে আগ্রহী।

অন্যদিকে ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের কাঠমান্ডু সফর বাতিল হওয়া এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নিয়ে অনাগ্রহের খবর নয়া দিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থলবেষ্টিত নেপালের জন্য চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতীক

বালেন শাহ শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতীক।

তাঁর পোশাক, আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার—সবকিছুই প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে আলাদা। সংসদে স্পোর্টস শু পরে যাওয়া কিংবা কালো পোশাকে উপস্থিত হওয়া প্রায়ই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

সমর্থকদের মতে, তিনি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করছেন। সমালোচকদের মতে, জনপ্রিয়তা ও প্রতীকী রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বাস্তবতা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

দুই মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, বালেন শাহর নেতৃত্বে নেপাল একটি নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান কতটা, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো সময়ের কাছেই রয়ে গেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ