ঢাকায় কোরবানির চামড়ার দাম গত বছরের চেয়েও কম

 


ঢাকায় কোরবানির চামড়ার দাম গত বছরের চেয়েও কম, মাঝারি গরুর চামড়া ৫০০-৬৫০ টাকা

কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম এবার সরকার গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বাড়ালেও রাজধানীর বাজারে সেই দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে না। বরং বিক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় প্রতি পিস চামড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দাম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ছাগলের চামড়া কেনায় এবারও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারিমালিকেরা তাঁদের কাছে সেই দামে চামড়া কেনার নিশ্চয়তা দেননি। বরং গত বছরের তুলনায় কম দামে কেনার কথা জানিয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া কিনছেন তাঁরা। তবে ট্যানারিমালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার দাম কমেনি, বরং প্রতি পিসে ৫০-৬০ টাকা বেশি রয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহার দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, ধানমন্ডি ও সায়েন্স ল্যাব এলাকা ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কোরবানির ঈদে ব্যক্তি, মৌসুমি ব্যবসায়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করে থাকে। এসব চামড়া কিনে নেন আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং ট্যানারিমালিকেরা।

প্রতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। গত ১৩ মে খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ বছরের দাম নির্ধারণ করেন। সে অনুযায়ী, ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।

সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের ২১-৩০ বর্গফুট এবং ছোট আকারের চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়ে থাকে।

সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট গরুর এক পিস চামড়ার দাম হওয়ার কথা ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়ার দাম হওয়ার কথা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তবে বাস্তবে কোরবানির ঈদের প্রথম দুই-তিন দিন ব্যবসায়ীরা মূলত কাঁচা চামড়া কেনাবেচা করেন। একটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে গড়ে ৩৫০ টাকা খরচ হয় লবণ ও শ্রমিক মজুরিতে। সেই হিসাবে ছোট আকারের কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাঝারি চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় চামড়া ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা ছিল।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

আজ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, ছোট আকারের কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। বাজারে সবচেয়ে বেশি ছিল মাঝারি আকারের চামড়া। গত বছর একই ধরনের চামড়ার দাম ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

অন্যদিকে এবারও প্রতি পিস ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়। গত দুই বছর ধরেও একই অবস্থা ছিল।

আট বছর ধরে কোরবানির মৌসুমে চামড়ার ব্যবসা করছেন ফারুক হোসেন। আজ দুপুরে কলাবাগান এলাকা থেকে ছোট ও মাঝারি মিলিয়ে ১৫ পিস চামড়া নিয়ে তিনি ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে আসেন। সেখানে উপস্থিত ব্যাপারী রুবেলের কাছে প্রতি পিস চামড়ার দাম ১ হাজার টাকা চান তিনি। কিন্তু রুবেল ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি।

পরে ফারুক দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও তাতেও বনিবনা হয়নি। এরপর তিনি সামনে এগিয়ে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে একটি ট্যানারির সংগ্রহকেন্দ্রে যান। সেখানেও প্রতি পিস ৮০০ টাকা চাইলে কর্মীরা ৬০০ টাকার বেশি দিতে চাননি। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেও চামড়া বিক্রি না করে অন্যত্র চলে যান তিনি।

ফারুক হোসেন বলেন, “গত বছর এই ধরনের চামড়া ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার দাম অনেক কম। ৭৫০ টাকা হলেও দিয়ে দিতাম। কিন্তু ৬৫০ টাকার ওপরে কেউ দাম বলছে না।”

রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় আজ দুপুরে চামড়া কিনছিলেন ফরিয়া মো. শাহজাহান। তিনি ট্যানারিতে সরবরাহের জন্য সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা থেকে ৫৫ পিস চামড়া কিনেছেন। প্রতিটি চামড়ার গড় দাম পড়েছে ৬৫০ টাকা।

মো. শাহজাহান বলেন, “এবার চামড়ার দাম কিছুটা কম। ট্যানারিমালিকেরা বলেছেন, গত বছরের তুলনায় রাসায়নিক ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই তাঁরা ৬০০-৭০০ টাকার বেশি দাম দেবেন না। এজন্য আমরাও ১০০-১৫০ টাকা কমে কিনছি। এতে শেষ পর্যন্ত প্রতি পিসে ৫০-৬০ টাকা লাভ থাকবে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কম দাম পাচ্ছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ দাবি করেছেন, এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি। তিনি বলেন, “বরং গত বছরের তুলনায় ২০-৫০ টাকা বেশি রয়েছে। আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে চামড়া কিনেছি।”

তিনি আরও জানান, রাজধানীর বাজার স্থিতিশীল রাখতে ট্যানারিগুলো সরাসরি কাঁচা চামড়া কিনছে। তবে দুপুর পর্যন্ত বাজার পুরোপুরি জমে ওঠেনি। বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে দাম আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

চামড়া আসার পরিমাণও কম

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। এর বিপরীতে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু।

তবে ট্যানারিমালিকেরা আগেই ধারণা করেছিলেন, এবার কোরবানি কিছুটা কম হতে পারে। সে কারণে তাঁরা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। গত বছর এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ লাখ।

কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দুপুর পর্যন্ত কাঁচা চামড়ার সরবরাহ গত বছরের তুলনায় কম মনে হয়েছে।

রাজধানীর টাউন হল বাজারে আজ দুপুর ১টার দিকে মৌসুমি ব্যবসায়ী উমায়ের হোসেন বলেন, “এবার পশু কোরবানি কিছুটা কম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাত্র ২৩টি চামড়া কিনতে পেরেছি। গত বছর একই সময়ে দেড় শতাধিক চামড়া কেনা হয়েছিল। সন্ধ্যার পর প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ