ওমানে বিষাক্ত গ্যাসে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যু

 

ওমানে বিষাক্ত গ্যাসে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যু, বন্ধ গাড়িতে ঘুমাতে নিষেধ পুলিশের

ওমানে একটি গাড়ির ভেতরে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরোধ হয়ে চার প্রবাসী বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে দেশটির পুলিশ।

রয়্যাল ওমান পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ওমান জানিয়েছে, গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায় এয়ার কন্ডিশনারের এক্সহস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হন ওই চার ভাই। ঘটনার পর পুলিশ জনগণকে বন্ধ গাড়ির ভেতরে ঘুমাতে নিষেধ করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।

চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ওমানের নেতারা প্রথম আলোকে জানান, বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহ যাচ্ছিলেন। রাত ৮টার কিছু পর তাঁদের একজন স্বজনকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তাঁরা গুরুতর অসুস্থ বোধ করছেন। নিজের অবস্থান পাঠিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে গাড়ি থেকে বের হওয়ার অবস্থাতেও নেই।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং মুখ ও নাক দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। তাঁরা মাকেও ফোন করে দোয়া চান।

পরে স্থানীয় লোকজন একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়িটি খুলে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত চার ভাই হলেন রাশিদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম।

শনিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, আগামী মঙ্গলবার চার ভাইয়ের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। নিহতদের স্বজন, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ওমান একই ফ্লাইটে চারটি মরদেহ দেশে আনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

ছেলেদের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না মা

মর্মান্তিক ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও চার ভাইয়ের মা খাদিজা বেগমকে এখনো জানানো হয়নি যে তাঁর ছেলেরা মারা গেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে শুধু বলা হয়েছে, তাঁরা গুরুতর অসুস্থ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্বজনরা জানান, ছেলেদের অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকেই খাদিজা বেগম নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পরিবার আশঙ্কা করছে, মৃত্যুসংবাদ শুনলে তিনি সেই ধাক্কা সহ্য করতে পারবেন না। তাই আপাতত সত্য গোপন রাখা হয়েছে।

কোনো স্বজন বা প্রতিবেশী যাতে ভুলবশত তাঁকে খবরটি না জানিয়ে দেন, সে জন্য পরিবারের একমাত্র জীবিত ছেলে ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ এনাম চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় তাঁদের বাড়ির ফটকে তালা লাগিয়ে রেখেছেন।

শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় বিএনপি সংসদ সদস্য Hummam Quader Chowdhury রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্দরাজপাড়া মসজিদে গিয়ে দোয়া করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি দ্রুত মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং পরিবারটির পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।

এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নজমুল হাসান, স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

স্বজনরা জানান, চার ভাইকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নিহতদের মামাতো ভাই ইমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে থাকা চার ভাইয়ের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পরিবারটি সম্প্রতি আর্থিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছলতা দেখতে শুরু করেছিল।

চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী জানান, মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর প্রায় ৮০ শতাংশ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি বলেন, “ঘটনার পর থেকেই আমরা দূতাবাস ও ওমান সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি আগামী মঙ্গলবার বিকেলে চার ভাইয়ের মরদেহ একসঙ্গে বাংলাদেশে পৌঁছাবে।”

তিনি আরও বলেন, মরদেহ দেশে পাঠানোর খরচ বহন করবেন নিহতদের স্বজন ও চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ওমান। যেহেতু এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, তাই ওমান সরকার এ ব্যয় বহন করবে না।

নিহত চার ভাইয়ের বয়স ছিল ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ