দেশের জন্য জীবন উৎসর্গে ‘জানফাদা’ কর্মসূচি, ৩ কোটি ৩০ লাখ ইরানির নিবন্ধনের দাবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে সাধারণ মানুষকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দেওয়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে ইরান। ‘জানফাদা’ নামের এই কর্মসূচিতে তরুণদের পাশাপাশি নারী ও বিভিন্ন বয়সী মানুষকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ইরান সরকারের দাবি, এতে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। তবে এ সংখ্যার স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রাতে বলেছেন, তিনি শিগগিরই ইরানে হামলা চালাচ্ছেন না। এর আগের দিন তিনি বলেছিলেন, রোববারের মধ্যে হামলা চালানো অথবা ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই উত্তেজনার মধ্যে দেশের নিরাপত্তা জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকি মোকাবিলার যুক্তিতে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান সরকার। কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাসেবকদের অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে।
‘জানফাদা’ শব্দের অর্থ জীবন উৎসর্গকারী বা যাঁরা দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে গত মার্চের শেষ দিকে কর্মসূচিটি চালু করা হয়। এরপর ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে এর কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে।
শহরে শহরে প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও সশস্ত্র মহড়া
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), এর অধীন বাসিজ মিলিশিয়া এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দেশের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ চত্বরে বুথ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা ও বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করা।
তেহরান, ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ ও আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে সরকারি উদ্যোগে সমাবেশ, অনুষ্ঠান ও সশস্ত্র মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের বড় ও ছোট শহরেও এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে।
চলতি মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলী কাউসারি জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ চত্বরকে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় আইআরজিসি। প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানীতে অন্তত এক থেকে তিনটি চত্বর ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে বর্তমানে ঠিক কতটি শহরে কর্মসূচিটি চলছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনের বেলায় সমাবেশ ও গাড়িবহর নিয়ে শোভাযাত্রা হচ্ছে।
ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা আল-জাজিরাকে জানান, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শহরের সড়কে নিয়মিত সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র দেখা যায়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এসব কেন্দ্রে কখনো কখনো ছোট পুরস্কারের প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়।
ওই বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণে তাজা গুলি ব্যবহার করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ম্যাগাজিনে গুলি ভরা, পিস্তল ও রাইফেল প্রস্তুত করা এবং নিশানা করে গুলি চালানোর পদ্ধতি শেখানো হয়।
তিনি আরও বলেন, আয়োজকদের বেশির ভাগই বয়স্ক পুরুষ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁরা প্রায় প্রতি রাতেই বিভিন্ন চত্বরে জড়ো হচ্ছেন। সেখানে বিপ্লবী গান বাজানো হয় এবং মাইকে স্লোগান দেওয়া হয়।
গত ১৫ অক্টোবর গিলান প্রদেশের রাশত শহরে রাতে সরকারপন্থী একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উচ্চ শব্দ ও সড়ক বন্ধ রাখার প্রতিবাদ জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে হাতাহাতি হতে দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি।
গত শনিবার তেহরানের কাছে আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরের বাসিন্দাদের সতর্ক করে কর্তৃপক্ষ জানায়, জানফাদা কর্মসূচির একটি মহড়া থেকে বিস্ফোরণ ও বিকট শব্দ শোনা যেতে পারে।
‘বিপ্লব হলো সাইকেল চালানোর মতো’
গত সপ্তাহে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশে বড় পরিসরে গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ইরাকের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এই প্রদেশের রাজধানী সানানদাজে আয়োজিত একটি শোভাযাত্রাকে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সি শিয়া ও সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের প্রদর্শনী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে ইরানের বাইরে অবস্থানরত কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন এসব সশস্ত্র কর্মসূচিকে জনগণকে ভয় দেখানোর উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
গত জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিক্ষোভ দমনের সময় গুলি ও ছুরিকাঘাতে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অনেক তরুণও ছিলেন।
ইরান সরকার স্বীকার করেছে, দেশের সব প্রদেশের ৪০০টির বেশি জেলায় বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে সরকার এসব ঘটনাকে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেছে, দেশটির শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে বিক্ষোভ সংগঠিত করেছিল।
বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতিবিষয়ক অধ্যাপক মেহরান কামরাভার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও কট্টর বিপ্লবপন্থীদের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, “বিপ্লব হলো সাইকেল চালানোর মতো। খারাপভাবে পড়ে যাওয়া এড়াতে হলে জোরে প্যাডেল চালিয়ে যেতে হয়। জানফাদা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ও তাঁদের নেতারা ঠিক সেটিই করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে চাইছেন।”
কামরাভা আরও বলেন, এই প্রশিক্ষণ ও গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি সরকারের কট্টর বিপ্লবপন্থী অংশের নেতাদের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক আনুগত্য প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে।
৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের দাবি, প্রশ্ন নিবন্ধনসংখ্যা নিয়ে
ইরান সরকার জানিয়েছে, জানফাদা কর্মসূচির ওয়েবসাইটে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে সরকার কোনো প্রমাণ দেয়নি। সংখ্যাটি দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এবং ১২ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষের মোট সংখ্যার অর্ধেকের বেশি।
চলতি বছরের শুরুর দিকে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন অধিকারকর্মী ওয়েবসাইটটির সোর্স কোড পরীক্ষা করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৪০ লাখের কম বলে দেখা যায়।
ওয়েবসাইটটিতে নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি ফোন নম্বর প্রয়োজন হতো। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে সরকারের ঘোষিত সংখ্যা ও স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
গত সপ্তাহে কর্মসূচিটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন লোরেস্তান প্রদেশের আইআরজিসি কমান্ডার নেমাতোল্লাহ বাঘেরি। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানায়।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবকদের ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযান, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও আর্থিক সহায়তার কাজে যুক্ত করা হতে পারে।
শিশুদেরও যুক্ত করার পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায়ও নিবন্ধিত ব্যক্তিদের সহযোগিতা চেয়েছে ইরান সরকার। এ জন্য তাঁদের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রভাবে ইরানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং বেসামরিক অবকাঠামোর একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জানফাদা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে সরকার। এতে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোকে ক্রমেই এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনে যুক্ত করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি জানান, বাসিজ মিলিশিয়া শিক্ষার্থীদের ‘শিক্ষার্থী জানফাদা’ হিসেবে নিবন্ধন করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে শিশুদের অংশগ্রহণে আরও কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে।
অধ্যাপক কামরাভার মতে, এ ধরনের গণসংগঠিতকরণ কর্মসূচি সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে সরকারের বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ সরকারের বর্তমান সমর্থকদের মধ্যে বিপ্লবের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্য সম্পর্কে বিশ্বাস আরও দৃঢ় করতে পারে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার যে মানসিকতা রয়েছে, সেটিও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন