গত ২০ বছরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চিত্র
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আবারও বিক্ষোভে নেমেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা। আজ সোমবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। এতে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।
একই সময়ে রাজধানীর মিরপুর-১০-এর সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় এবং পরে মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামসংলগ্ন প্রশিকা মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগের দিন রোববার (১ নভেম্বর) কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর বাজার, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম এবং পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়। বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার কারণে ওই দিন অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত দুই দশকে মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দ্রব্যমূল্যের পরিবর্তন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দুই দশকে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কত বেড়েছে
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৯৪ সালে প্রথম নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। ওই বোর্ড শ্রমিকদের মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করেছিল ৯৩০ টাকা।
পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে এই মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। এরপর ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
২০২৩ সালে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাসিক ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানানো হয়েছিল। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার কথা ছিল। এ জন্য মজুরি বোর্ড ছয়টি সভা করে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বোর্ড মাসিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করে। পরে ডিসেম্বরে সরকার চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
তিন বছরে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে
মজুরি বাড়লেও গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ২০২৩ সালের নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখন অনেক কমে গেছে।
প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১২ হাজার ৫০০ টাকার বর্তমান ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার ৬৮৭ টাকার সমান।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, এই আয় দিয়ে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় নির্বাহ করা কতটা সম্ভব?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের ৩ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। শহরাঞ্চলে এই ব্যয় আরও বেশি, প্রায় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা।
এই হিসাবে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে গ্রামাঞ্চলের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের মাত্র ৩৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব। শহরাঞ্চলে তা প্রায় ৩৮ শতাংশ।
পরিবারের মাসিক ব্যয় নিয়ে গবেষণায় ভিন্ন চিত্র
তবে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয়ের কিছুটা ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ২০ হাজার ৮২৬ টাকা। খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়।
এসব পরিসংখ্যান থেকে শ্রমিকদের পাশাপাশি দেশের সাধারণ পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কতটা বেড়েছে, তা স্পষ্ট হয়।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বের অভিযোগ
২০২৩ সালে মজুরি বোর্ড গঠনের পর চূড়ান্ত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করতে প্রায় সাত মাস সময় লেগেছিল। ওই বছরের এপ্রিলে বোর্ড গঠিত হয় এবং ৭ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়।
সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরের পরবর্তী প্রক্রিয়া বিবেচনায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের কথা ছিল। তবে শ্রমিকদের আন্দোলন ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে।
এ বিষয়ে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের বিলম্বের কারণে শ্রমিকদের একটি অংশ আন্দোলনে নেমেছেন।
তিনি বলেন, এখন তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত আলোচনা শুরু করে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে। এতে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন