জুলাই–যাপন: দুই বছর পার করে পাওয়া–না–পাওয়া
যেকোনো মানুষের জীবনে কোনো জাতীয় ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার যদি ন্যূনতম কোনো সৌভাগ্য থেকে থাকে, তবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ আমি পাইনি। তবে স্বৈরাচারের পতনের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তখন বয়স কম; কৈশোরের চোখে দেখা সেই সময়ও ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
পরবর্তী দশকগুলোয় দেখেছি, সে সময়ের আবেগে গণতন্ত্রের জন্য যা কিছু আরাধ্য মনে হয়েছিল, তা একে একে ভেঙে পড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছে, দেশের রাজনীতি কর্তৃত্ববাদে নিমজ্জিত হয়েছে। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে গুম, খুন, নিপীড়ন, নির্যাতন, বাক্স্বাধীনতা, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম—সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লুটপাট ও সম্পদ পাচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। ফলে জুলাই ছিল অনিবার্য। আওয়ামী লীগের পাপ ও পতনের কারণেই আমরা জুলাইয়ের সাক্ষী হতে পেরেছিলাম; এর জন্য আলাদা কোনো ষড়যন্ত্রের প্রয়োজন ছিল না।
জনগণের সংগঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি উপলক্ষ। আবু সাঈদ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, মুগ্ধ, রিয়া, নাইমারা সেই উপলক্ষ হয়ে আমাদের সামনে পাহাড়সম দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। শত শত অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণ আমাদের ধাক্কা দিয়ে রাজপথে নামিয়েছিল। আমরা গানের মিছিল, মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম। শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অবরোধ ভেঙে দেওয়া রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড আর পেটে ঠেকিয়ে ছোড়া পুলিশের গুলি আমাদের হাজারে হাজারে ফুঁসে উঠতে শিখিয়েছিল। তখনই যেন আমরা উপলব্ধি করেছিলাম—আমরা এখনো বেঁচে আছি, এবং সেই বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের প্রতিরোধ।
মানুষ এক হলে কী ঘটতে পারে, তা দেখার জন্য যেমন বেঁচে ছিলাম, তেমনি আজ তা নিয়ে লিখতে বসার জন্যও বেঁচে আছি। জুলাইয়ের শহীদদের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে মরিনি। তেমন কিছু করাও হয়ে ওঠেনি, যাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হতো। তবু দুঃখ হয়—যারা ক্ষুধার্ত মানুষের মতো বুক পেতে গুলি খেয়ে, প্রাণের স্তূপ রচনা করে আমাদের আগস্ট এনে দিয়েছিল, তাদের মতো নির্ভীক হতে পারিনি। মানুষ জীবনে কবারই বা এমন বিস্ময়কর সাহসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পায়?
সেই বিস্ময়কর তরুণ প্রাণগুলো টানা ৩৬ দিন ছিল অকাতর ও অবিচল। কারও হাতে দোতারা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড; কারও হাতে স্কেল, কারও স্কুলব্যাগ; কারও কাছে মরিচের গুঁড়া, বাটন ফোন; কারও বুকে লেখা স্লোগান, হাতে স্প্রে-ক্যান; কারও কাছে কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচার জন্য খবরের কাগজ কিংবা টুথপেস্ট। কারও মাথায় টুপি, কারও হিজাব, কারও কপালে জাতীয় পতাকার ব্যান্ডানা। টি-শার্ট, লম্বা কুর্তা, বোরকা কিংবা জিন্স—সব পোশাকেই লেগেছিল পথের সঙ্গীর রক্ত আর টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া। প্রতিদিন দেখেছি, সেই ঘামে ভেজা শরীর থেকে ঝরে পড়েছে অতল সাহস। দেখেছি শিক্ষক নামের বহু ভীত মানুষের চোখেও সেই সাহসের প্রতিফলন—প্রতিটি প্রাণের হিসাব চাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। দেখেছি হাসিনার বন্দনায় ক্লান্ত সংস্কৃতিকর্মীদের পেছনে ফেলে তরুণদের মানববন্ধন, আকস্মিক মিছিল আর গানের গর্জন। কারফিউ ভাঙার সাহস ধীরে ধীরে তাদের হাতের মুঠোয়, চোখের তারায় জমা হয়েছিল; সেই সাহসই একসময় দ্রোহযাত্রায় রূপ নিয়েছিল।
১৯ জুলাই সংসদ ভবনের সামনে শুরু হওয়া সেই যাত্রা ২ আগস্ট শহীদ মিনারের দিকে সগর্জনে এগিয়ে যায়। কাতারে কাতারে মানুষ সেদিন মিছিলে যোগ দিয়েছিল। অজগরের মতো বিশাল সেই মিছিল শহরটাকে যেন পেঁচিয়ে ধরেছিল। তবে জুলাই একা আসেনি; তার সঙ্গে এসেছিল আগস্ট—যে আগস্ট আমাদের একই সঙ্গে মুক্তি ও বন্ধন উপহার দিয়েছে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর তাঁর রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ ও বিশৃঙ্খলা আমাদের সামনে এক বিশাল শূন্যতার মুখ খুলে দেয়। সেই শূন্যতা সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি রাষ্ট্রের ছিল না। এই শূন্যতার সামনে আমরা হারিয়েছি আমাদের সবচেয়ে সাহসী অগ্রসারিদের। পেছনের কুশীলবদের কৌশলের মুখে সাহসী কিন্তু অনভিজ্ঞ তরুণদের অনেকেই ফিরে যায় পড়াশোনায়। অথচ তাদের মন পড়ে থাকে সেই রাজপথেই—যেখানে গুলি খাওয়ার ক্ষুধা, প্রতিরোধের উত্তাপ। ধারাবাহিক আঘাতে তাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া হয়, ক্ষয়ে দেওয়া হয় তাদের মনোবল।
আগস্ট শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় জুলাইয়ের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতা। শহীদের রক্ত আর আহতদের আর্তনাদের মধ্যেই শুরু হয় ক্ষমতা দখলের খেলা। সেই সুযোগে উগ্র ডানপন্থা—কখনো ‘তৌহিদি জনতা’, কখনো ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ পরিচয়ে—শক্তি সঞ্চয় করে দেশের ওপর চেপে বসে। অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব প্রশ্রয়ে তারা মহীরুহে পরিণত হয়। আক্রমণের শিকার হন নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী, নারী, মাজার, বাউলসহ নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। হামলা হয় সংগীত, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনে। ভেঙে ফেলা হয় মাজার, ভাস্কর্য ও শিল্পস্থাপনা। শিক্ষাঙ্গনে শুরু হয় ‘মব’ নামে নতুন এক সংস্কৃতি। প্রথমে যার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকেরা, পরে তা জুলাইয়ের সম্মুখসারির শিক্ষকদেরও সাইবার হয়রানি থেকে চাকরিচ্যুতির পর্যায়ে নিয়ে যায়—ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক তার একটি দৃষ্টান্ত। জুলাইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল গঠিত হলেও এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই তারা নীরব থেকেছে। কেউ কেউ আবার পরোক্ষভাবে বৈধতাও দিয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ধ্বংসযজ্ঞে উসকানিও এসেছে তাদেরই একটি অংশ থেকে। নারীর অবমাননাকর সমাবেশে উপস্থিত থেকে কিংবা নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে অংশ নিয়ে তারাও একধরনের সম্মতি উৎপাদন করেছে।
এর পাশাপাশি চলতে থাকে ‘ঐকমত্য’-এর নামে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর-কষাকষি, যার ফলাফল শেষ পর্যন্ত শূন্য। এই দর-কষাকষির আড়ালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য থেকে আগত সুশীল ‘বয়েজ ক্লাব’ ঐকমত্য গড়তে ব্যর্থ হলেও উগ্র ডানপন্থীরা সহিংসতা ও অরাজকতার মাধ্যমে ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় সফল হয়। তরুণদের রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ে, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের ডানমুখী সরে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়।
জুলাই দখল-বেদখল হয়, কিন্তু শহীদের মায়ের আহাজারি বদলায় না। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা এবং দেশে থাকা তাদের সমর্থকেরা জুলাইকে অস্বীকার করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ডানপন্থার উত্থান দেখিয়ে তারা দাবি করে—জুলাই ছিল ডানপন্থীদের ষড়যন্ত্র, ছিল ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’। হাজার প্রাণ ঝরার পরও তাদের মধ্যে অনুশোচনার কোনো চিহ্ন নেই। তারা বলে—আগেই ভালো ছিলাম। সত্যিই তারা ভালোই ছিল, কারণ ফ্যাসিবাদের অনুকম্পায় তাদের ভাগে খুদকুঁড়ো জুটত। সেই সুবিধা হারিয়েই আজ তাদের হাহাকার। লুটের টাকায় বিদেশে বসে কেউ কেউ এখনো প্রশ্ন তোলে—‘এমন দেশ কি চেয়েছিলাম?’
জুলাইয়ে আমরা শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু ক্ষমতার হঠকারিতা সেই সুযোগের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এই ব্যর্থতা জুলাইয়ের নয়, রাজপথে নামা জনতারও নয়। এটি অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা। শেখ হাসিনার পতন ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু জুলাই কেবল শাসক পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, কোনো ‘কালার রেভোল্যুশন’ও ছিল না। জুলাই ছিল রাষ্ট্র বদলের আকাঙ্ক্ষা; রাষ্ট্র সংস্কারের, চিন্তার সংস্কারের, নাগরিক অধিকারের ন্যূনতম নিশ্চয়তা অর্জনের প্রয়াস। একাত্তরের স্বাধীনতা কিংবা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও যে স্বপ্ন অপূর্ণ ছিল, বহু বছর পর সেই সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সেই দায় কাঁধে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক দল কিংবা সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। হয়তো একের পর এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে গিলে খাওয়ায় এই শূন্যতার জন্ম হয়েছে।
প্রতিটি অভ্যুত্থানের পরই এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেখান থেকেই ঝড়ের জন্ম। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই ঝড় সামলানোর দায়িত্ব যাদের ছিল, তারাই সবচেয়ে দুর্বল প্রমাণিত হয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো। সারা বিশ্বেই ডানপন্থার উত্থান ঘটছে; বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কিন্তু এই প্রবল সামাজিক ফ্যাসিবাদী শক্তিকে প্রতিহত করতে হলে প্রয়োজন নাগরিক ঐক্য—যার ভিত্তি হবে সাম্য, বৈষম্যহীনতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সবার সমান নাগরিক অধিকার। ডানপন্থার উদ্বেগজনক উত্থান ঠেকাতে এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতের প্রতিরোধের ভাষ্য আসতে হবে বামপন্থী রাজনীতি ও মূল্যবোধ থেকেই।
কারণ, জুলাইয়ের পর আবারও জুলাই আসে। ক্ষমতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে জুলাইয়ের বয়ানও বদলে যায়। নতুন সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বিতর্কিত চুক্তি বাতিল করে না; বিরোধী দলও নীরব থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবার শুরু হয় দলীয়করণ।
অথচ জুলাইয়ে রক্ত দেওয়া শহীদেরা আর ফিরে আসেন না। হামে মারা যাওয়া শিশুরাও আর ফিরে আসে না। তাদের বাবা-মায়েরা কেবল আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আর আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তহীন বিতর্কে মেতে থাকি। অথচ এখনই সময় সমস্যার মূলে পৌঁছানোর, কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ খোঁজার।
এই কারণেই জুলাইয়ের শহীদ নাইমার ইস্পাত-কঠিন মা আজও উত্তরার মাইলস্টোন চত্বরে বসে কালো পর্দায় ঢাকা জুলাই-কন্যাদের শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। অসংখ্য বাধা সত্ত্বেও শহীদ-কন্যাদের জন্য নির্মিত সেই স্মৃতিস্তম্ভের কালো আবরণ আজও সরানো হয়নি। অথচ জুলাই আমাদের শিখিয়েছিল—মানুষ সব মনে রাখে। জনগণের যৌথ স্মৃতিতে সবকিছু থেকে যায়। ইতিহাসেরও স্বভাব তাই। যত বেশি ভুলিয়ে দিতে চাওয়া হয়, তত গভীর হয়ে তার দাগ মানুষের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে বসে।

0 মন্তব্যসমূহ