বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল

 


সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল

জাতীয় সংসদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করেই আজ বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত দুটি বিল পাস করা হয়।

সংসদে পাস হওয়া বিল দুটি হলো—‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে এবং বিচার বিভাগ পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।

তবে অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন বিচারকসহ নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপ বৈধ বলে গণ্য হবে।

সচিবালয় বিলুপ্ত, দায়িত্ব হস্তান্তর

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় এই সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। এর অধীন বাজেট, প্রকল্প ও কর্মসূচি আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃষ্ট পদগুলোও বাতিল হবে এবং সেখানে কর্মরত কর্মকর্তারা পূর্বের আইনের আওতায় ফিরে যাবেন।

রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিলগুলো আইনে পরিণত হবে।

বিরোধী দলের অভিযোগ

বিরোধী দল এই উদ্যোগকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার আবারও ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করছে।

সরকারের অবস্থান

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরও যাচাই-বাছাই করে এ বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।

পূর্বের পরিবর্তন ও বর্তমান অবস্থা

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারক নিয়োগ দেন, তবে কার্যত এটি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী হয়ে থাকে। অতীতে বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের নতুন প্রক্রিয়া চালু করেছিল। কিন্তু নতুন বিল পাস হওয়ায় সেই ব্যবস্থা আর থাকছে না।

বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

সংসদে বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই বিল অসাংবিধানিক এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। তিনি বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

এর জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকলেও সংসদকে আইন প্রণয়নে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের নেই।

এ সময় তিনি অতীতের বিভিন্ন বিচারিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অপব্যবহারও হয়েছে।

আরও আপত্তি ও আলোচনা

পরবর্তীতে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ নিয়েও আপত্তি তোলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, মূল সমস্যা বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়, এবং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা সংস্কারটি ইতিবাচক ছিল।

তিনি যুক্তি দেন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পৃথক কাউন্সিল প্রয়োজন ছিল।

আইনমন্ত্রীর জবাব

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, অতীতে দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বিচার বিভাগের জন্য ক্ষতিকর ছিল। সরকার এখন আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে চায়।

তিনি জানান, এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনসহ বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।

বিল পাস

শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের সব আপত্তি নাকচ হয়ে যায় এবং বিল দুটি পাস হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারকের নামের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষণ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ