মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ব্যবসায় ধাক্কা, ছোট উদ্যোক্তারা গভীর উদ্বেগে
কেরানীগঞ্জের জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ—প্রায় ৮০০ শ্রমিকের একটি প্লাস্টিক খেলনা তৈরির কারখানায়—মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে প্লাস্টিক খেলনা তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আমদানি কমাতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ সংকট বাড়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোডশেডিংও বেড়েছে। ফলে কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, আর বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সুমন প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের বেশ কয়েকটি আমদানি আদেশ বাতিল করতে হয়েছে। স্থানীয় বাজারের সিন্ডিকেটও দাম বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “দিন-রাত মিলিয়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ রাখতে হওয়ায় পাইকারি বিক্রি কমে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
সুমনের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট উদ্যোক্তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলার পর শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই সংকটের সমাধানের কোনো লক্ষণ না থাকায় ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
হাত বাকসোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাফাত কাদির বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের ব্যবসার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ করপোরেট অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। আগেই নেওয়া অর্ডারের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই, ফলে আমরা লোকসানে পড়ছি। পহেলা বৈশাখের পর থেকে অনলাইন বিক্রিও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।”
ফরিদপুরের গোপালপুরে আরকে মেটাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান পেঁয়াজ সংরক্ষণ যন্ত্র, ঘাস কাটার মেশিন, ধান ও ভুট্টা মাড়াই যন্ত্রসহ কৃষিযন্ত্র তৈরি করে। গত দুই বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে, আর মধ্যপ্রাচ্য সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। এখন কৃষিযন্ত্রের বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিতোষ কুমার মালো বলেন, “দুই বছর আগে আমাদের কারখানায় ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এখন মাত্র ৮ থেকে ১০ জন আছেন।”
তিনি আরও বলেন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক মোটরের দাম বৃদ্ধিতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অনেক সরকারি প্রকল্প স্থগিত রয়েছে, আর ভর্তুকি না পাওয়ায় কৃষকেরাও নতুন যন্ত্র কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আজই যদি ইরান যুদ্ধ শেষ হয়, তবুও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, “যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সরকার কেবল স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে নির্ভর করতে পারে না। ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।”
দেশজুড়ে ছোট উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মূলত চারটি বড় সমস্যার মুখে পড়েছেন: কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট; বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া; জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া; এবং সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ থাকার কারণে বিক্রি কমে যাওয়া।
অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছে যে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মুখে সরকার গত মাসে জ্বালানি রেশনিং চালু করে। এরপর থেকে পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে যানবাহনের চালকদের, অনেকেই আবার জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এর মধ্যে গত শনিবার রাতে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চাপের মুখে ছোট উদ্যোক্তারা
হাত বাকসো নামের হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানটি মিনিয়েচার প্রতিরূপ, ফ্রিজ ম্যাগনেট, ফ্রেম, পেপারওয়েট, কার্ড হোল্ডার, ডেস্ক ক্যালেন্ডার, ল্যাপেল পিন, কোট পিন, টাই পিন, কাফলিংক, কী রিং ও লাগেজ ট্যাগসহ নানা পণ্য তৈরি করে। করপোরেট গ্রাহকরাই এর প্রধান ক্রেতা হলেও অনলাইনেও পণ্য বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।
যুদ্ধের কারণে তাদের প্রধান কাঁচামাল রেজিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে মুনাফার ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ