জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ চায় সরকার
১. চার মাসে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার আমদানির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার।
২. একই সময়ে ভর্তুকি মেটাতে অতিরিক্ত দরকার হবে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা।
৩. ২০২২ সালের অনুরূপ সংকটের পর দেশে দারিদ্র্যের হার ৯ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
৪. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
৫. এই চাপ মোকাবিলায় সরকার প্রায় ৩০০ কোটি ডলার (প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) বাজেট সহায়তা ঋণের সন্ধান করছে। মার্চ থেকে জুন সময়ের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এই অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ।
৬. চিঠির সঙ্গে পাঠানো অবস্থানপত্রে বলা হয়েছে, এই ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, জ্বালানি-সার-খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অস্থায়ী সহায়তা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণেও এটি কাজে লাগানো হবে।
৭. অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপের মুখে পড়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জরুরি ঋণ সহায়তা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
৮. এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কারণ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ঋণের বিষয়টি উত্থাপন করা হতে পারে।
৯. ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও একই ধরনের সংকটে পড়ে বাংলাদেশ। তখন জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যায় এবং মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করে।
১০. সে সময় ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার বেশি হয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে।
১১. বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সারের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হলেও আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি, ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
১২. বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি’র তথ্যমতে, তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
১৩. পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবার চাপ তৈরি করেছে।
১৪. সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, যা আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে।
১৫. বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার, যার বড় অংশই জ্বালানি ও সারের পেছনে ব্যয় হয়েছে।
১৬. যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজির দাম ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৭. একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ফেব্রুয়ারির ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে মার্চে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
১৮. মার্চ থেকে জুন ২০২৬ সময়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হবে প্রায় ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা, যা বাজেট বরাদ্দের তুলনায় অনেক বেশি।
১৯. সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলেও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২০. জরুরি ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে অতীতের মতো সংস্কার শর্ত পূরণের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
২১. এদিকে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে, যা ইতিমধ্যে ১১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
২২. অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাজেট সহায়তা চাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে ঋণ পেতে হলে সরকারের নীতিগত অবস্থান ও বাজার সমন্বয় নিয়ে স্পষ্টতা দেখাতে হবে।

0 মন্তব্যসমূহ