অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালের ১৭ মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬) দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে নূর খান লিটন বলেন, এই সময়ে কিছু অদৃশ্য শক্তির তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে গণ-অভ্যুত্থানের সক্রিয়তা, চরিত্র ও আদর্শ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে জনমনে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়েছে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পেছনে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং স্থাপনা দখলের মতো কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত ও ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। ৩০০-এর বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় ও ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনায় পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
মব ভায়োলেন্স ও সাংবাদিক নির্যাতন
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ মাসে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এ সময় ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় ৪১টি মামলায় ৬৯ জন অভিযুক্ত ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন। অধিকাংশ মামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টকে কেন্দ্র করে হওয়ায় এসব আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যাদের মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ কয়েকজনের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁদের পরিবার পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা এবং ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
মাজারে হামলা, সীমান্ত হত্যা ও অন্যান্য নির্যাতন
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তে সংঘটিত ১১০টি ঘটনায় ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হন। বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে হামলায় আরও ৩ জন নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শ্রমিক নির্যাতন ও কর্মস্থল দুর্ঘটনায়ও শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস জানিয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ সময়কালের ওপর এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে মনিরুজ্জামানসহ সংগঠনের অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

0 মন্তব্যসমূহ