৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত, তীব্র হচ্ছে লোডশেডিং
দেশে চলমান গ্যাস সংকটের সঙ্গে এবার কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতিও যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি কেন্দ্র নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গরমের মধ্যে বেড়েছে লোডশেডিং, বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৩৭টি। এর মধ্যে ৬৪টি সরকারি, ৭০টি বেসরকারি এবং তিনটি ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশের ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ ছিল। অন্য কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি।
এর ফলে বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।
এক মাস ধরে বিদ্যুৎ সংকট
দেশে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। প্রায় একই সময় ধরে লোডশেডিংও অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টি হলে কিছুটা স্বস্তি মিললেও তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে লোডশেডিংও তীব্র হচ্ছে।
শুরুতে মূলত ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতেই লোডশেডিং সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহে কাটছাঁট শুরু হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কোনো এলাকায় দিনে একবারের বেশি এবং সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় এর চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জালোওয়াশান আখতার খান জানান, প্রতিদিন একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুবার লোডশেডিং হয়েছে।
তিনি বলেন, এর মধ্যে ভবনের জেনারেটরও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে লিফটে আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বাসায় গ্যাসের সরবরাহও নিয়মিত না থাকায় অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
ঢাকায় লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা
ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আরও ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে।
বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত লোডশেডিং না করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই এলাকায় দিনে একবারের বেশি বিদ্যুৎ বন্ধ না রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তবে বিদ্যুতের প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
আবার বাড়ছে লোডশেডিং
পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ১০ আগস্ট। ওই দিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
৯ আগস্ট থেকে টানা এক সপ্তাহ গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গত দুই দিনে আবার বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি। আবার তেলচালিত কেন্দ্রগুলোও সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। বিভিন্ন সময় বিরতির প্রয়োজন হওয়ায় এসব কেন্দ্রকে কম সক্ষমতায় চালাতে হয়। এতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।
অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগছে না
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট।
বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু গ্যাসের অভাবে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের কারণে গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তেলচালিত কেন্দ্র বাড়তি খরচে চালানো হচ্ছে
তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। তারপরও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এসব কেন্দ্র বেশি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। দিনে উৎপাদন সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকছে।
দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতি ছিল।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও সংকট
দেশে বর্তমানে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম।
কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ।
এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমিয়েছে।
দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সরবরাহ বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে
ঢাকার বাইরে দেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। কিছু এলাকায় পিডিবিও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
আরইবি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে একই এলাকায় দিনে একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বুধবার রাত ১২টার দিকে সারাদেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। একই সময়ে আরইবির আওতাধীন এলাকাগুলোতেই লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে বকেয়া বিল বাড়তে থাকায় এসব কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে।
তার মতে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পিডিবির বকেয়া ও অন্যান্য বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে এখনো তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
গ্যাসের সরবরাহও বাড়েনি
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতিও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচা এলাকার বাসিন্দা শর্মিলা শর্মি জানান, বুধবার বিকেলে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। পরে রাত ১০টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে সাড়ে ১১টার দিকে ফিরে আসে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে আবার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং প্রায় এক ঘণ্টা পর ফিরে আসে।
তিনি জানান, বেশির ভাগ সময় বাসায় গ্যাসও থাকে না। ফলে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে, কিন্তু দুর্ভোগ কমেনি।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন নিয়মিত কমছে। স্বাভাবিক সময়ে মোট সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত রাখা হয়। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার এলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল ৭৪ কোটি ঘনফুটেরও কম। ফলে ওই দিন দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুটে।
গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন, রান্না ও পরিবহন খাতেও সংকট বাড়ছে।
এলএনজি সরবরাহে নতুন বাধা
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে।
গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট পরিচালিত একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে গিয়ে সংকট তীব্র হয়।
১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আবার গ্যাস সরবরাহের উপযোগী হলেও নির্ধারিত সময়ে এলএনজি কার্গো না আসায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
তার মতে, সংকটের সময়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অনুপযুক্ত জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার না হলে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দূর করা কঠিন হবে এবং সংকটও স্থায়ীভাবে কাটবে না।

0 মন্তব্যসমূহ