আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: অংশ না নিলে আর্থিকভাবে কতটা ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ
আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। সহ–আয়োজক দেশ ভারত যদি ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তন না করে, তাহলে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে অংশ নেবে না—এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে জানিয়েছে সরকার।
বুধবার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিশ্বকাপ দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, “আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই।”
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ভেন্যু পরিবর্তন না করার ঘোষণা দেওয়ার পরও বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় দেশটির ক্রিকেট অঙ্গনে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিসিবির প্রধান আয়ের উৎস
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপ থেকে আয় করে থাকে। তবে বিসিবির সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হলো আইসিসি। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের মতে, বোর্ডের মোট বার্ষিক আয়ের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই আসে আইসিসির কাছ থেকে।
বার্ষিক রাজস্ব বণ্টনের পাশাপাশি আইসিসি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া দলগুলোকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে অংশগ্রহণ ফি এবং টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অতিরিক্ত আয়। বাংলাদেশ যদি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তাহলে এই সব আয় থেকেই বঞ্চিত হবে বিসিবি।
সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর হিসাব অনুযায়ী, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রায় ২৭ লাখ মার্কিন ডলার (৩৩০ কোটিরও বেশি টাকা) ক্ষতি হতে পারে। এটি আইসিসির মোট রাজস্বের প্রায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রাপ্য অংশ।
বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া আইসিসির অংশগ্রহণ–সংক্রান্ত নিয়মের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে বিসিবির আইসিসি থেকে পাওয়া রাজস্ব বণ্টনের বড় একটি অংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, কারণ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ও রাজস্ব বণ্টন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
আইসিসির অর্থ ছাড়াও সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে বড় অঙ্কের আয় হারাতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সব মিলিয়ে বিসিবির বার্ষিক আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেই প্রতিটি দল পায় ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা)। বাংলাদেশ অংশ না নিলে এই অর্থ তো পাবেই না, পাশাপাশি বিভিন্ন পর্বে জয় ও অগ্রগতির জন্য নির্ধারিত পুরস্কার অর্থ থেকেও বঞ্চিত হবে। খেলোয়াড়রাও ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস ও পুরস্কারমূলক আয়ের সুযোগ হারাবেন।
সম্প্রচারক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রভাব
বর্তমানে ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণ টি–টোয়েন্টি। স্বাভাবিকভাবেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিশ্বজুড়ে বিপুল দর্শক টানে। বাংলাদেশ অংশ না নিলে দেশের সম্প্রচার বাজারেও বড় ধাক্কা লাগবে।
ভারতীয় গণমাধ্যম রেভস্পোর্টস-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে টুর্নামেন্টটির অফিসিয়াল সম্প্রচারক টি স্পোর্টস প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি হতে পারে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ দলের ম্যাচ সাধারণত উপমহাদেশজুড়ে বড় দর্শকসংখ্যা আকর্ষণ করে, ফলে দল না খেললে বিজ্ঞাপন ও স্পনসরদের আগ্রহও কমে যাবে।
গণমাধ্যমে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের আসরে আইসিসি পুরস্কারমূল্যের অর্থ ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। গ্রুপ ও সুপার এইটে প্রতি জয়ের জন্য দলগুলো পায় ৩১ হাজার ১৫৪ ডলার। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ স্থানে থাকা দলগুলো পায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলার করে। সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দল পায় ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার, রানার্সআপ পায় ১৬ লাখ ডলার এবং চ্যাম্পিয়ন দল পায় ৩০ লাখ ডলার।
এ ছাড়া, আইসিসিকে সন্তোষজনক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলে বিসিবিকে প্রায় ২ লাখ ডলার (প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা) জরিমানাও গুনতে হতে পারে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি
আগামী সেপ্টেম্বরে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি–টোয়েন্টি খেলতে ভারতের বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। তবে সম্পর্কের অবনতি হলে এই সিরিজ বাতিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিসিবি আরও একটি বড় আয়ের সুযোগ হারাবে, কারণ ভারতের বিপক্ষে সিরিজগুলো সম্প্রচারক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় ভবিষ্যতে ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে না-ও আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আর্থিক দিক থেকে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ অন্য যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজের তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক।
আইসিসির বর্তমান রাজস্ব বণ্টন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৪–২০২৭ চক্রে বিসিবির বছরে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা পাওয়ার কথা। তবে ধারাবাহিকভাবে আইসিসির আহ্বানে সাড়া না দিলে ২০২৮ সাল থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী চক্রে বাংলাদেশের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। এমনকি আইসিসির বিভিন্ন কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং ভোটাধিকারও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্রিকেটীয় প্রভাব
আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রিকেটীয় দিক থেকেও বড় প্রভাব পড়তে পারে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশ পরবর্তী আসরের জন্য সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে মূল পর্বে খেলতে হলে দলকে বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে হতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ