বন্দীদের দুজন চেপে ধরতেন, জিয়াউল গুলি করতেন: পাথরঘাটার জেলের জবানবন্দি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানীর জেলে মো. আব্বাস মল্লিক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বুধবার দেওয়া জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক অভিযোগ করেন, গভীর নদীতে নিয়ে বন্দীদের একজন করে নৌকার সাপোর্টের ওপর বসিয়ে দুজন র্যাব সদস্য চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান তাঁদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন। পরে মৃতদেহের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে তিনি দাবি করেন।
এই মামলায় একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান। তিনি বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে আছেন এবং বুধবার তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
র্যাবের নৌযান ব্যবহারের অভিযোগ
জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, ২০১০ সাল থেকে র্যাবের সদস্যরা পাথরঘাটার চরদুয়ানী ও কাঁঠালতলী এলাকায় যাতায়াত করতেন। অভিযানের জন্য স্থানীয় নৌকা ও ট্রলার মালিকদের কাছ থেকে নৌযান নেওয়া হতো।
তিনি বলেন, অভিযানের দিন বিকেলে সাদাপোশাকে দুই র্যাব সদস্য এলাকায় এসে দোকানিদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ এবং আলো নিভিয়ে রাখার নির্দেশ দিতেন। রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফকলের সামনে থামত। সেখান থেকে বন্দীদের নৌকায় তুলে দেওয়া হতো বলে তিনি জানান।
আব্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বন্দীকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হতো। তাঁদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। নৌকায় তোলার পর রিয়াজের দোকান থেকে সিমেন্টের বস্তা, দড়ি ও হোগলা নেওয়া হতো। এরপর মাঝিদের নৌকা চালিয়ে বলেশ্বর নদীর দিকে যেতে বলা হতো।
গভীর নদীতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
আব্বাস মল্লিক বলেন, তাঁদের আরও গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। সেখান থেকে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে গভীরে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হতো।
তাঁর দাবি, গভীর পানিতে পৌঁছানোর পর বন্দীদের নৌকার ভেতরের অংশ থেকে বের করে আনা হতো। এরপর দুজন র্যাব সদস্য তাঁদের নৌকার দুই পাশে থাকা ‘সাপোর্ট’ অংশে বসিয়ে চেপে ধরতেন।
আব্বাসের জবানবন্দি অনুযায়ী, এরপর জিয়াউল আহসান বন্দীদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন। কোনো বন্দীকে একবার এবং কাউকে দুইবার গুলি করা হতো বলে তিনি দাবি করেন।
পরে মৃতদেহের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে সাক্ষী জানান।
সুন্দরবনে নিয়েও হত্যার অভিযোগ
আব্বাস মল্লিক আরও বলেন, এভাবে একের পর এক বন্দীকে হত্যার পর তাঁদের সুন্দরবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে আরও বন্দীদের নৌকা থেকে নামিয়ে তাঁদের হত্যার ঘটনাকে অন্যভাবে উপস্থাপন করা হতো বলে তিনি দাবি করেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে র্যাব সাংবাদিকদের ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে আনত এবং বিভিন্ন থানায় লাশ হস্তান্তর করা হতো।
নৌকা ধোয়ার কারণ কী ছিল
আব্বাস মল্লিক বলেন, এরপর মাঝিরা নৌকা ধুয়ে চরদুয়ানীতে ফিরে আসতেন। তাঁর দাবি, নৌকাগুলো ধোয়ার প্রয়োজন হতো কারণ হত্যার পর বন্দীদের শরীর থেকে রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও মস্তিষ্কের অংশ বের হয়ে নৌকার ভেতরে পড়ে থাকত।
তিনি জানান, সুন্দরবন থেকে চরদুয়ানীর বরফকল এলাকায় ফিরে আসার পর মেজর সাব্বির তাঁদের বলতেন, ‘তোমাদেরকে জিয়া স্যার ডাকে।’
এরপর মাঝিরা জিয়াউল আহসানের কাছে গেলে তাঁদের প্রত্যেককে কখনো ২ হাজার, আবার কখনো ৫ হাজার টাকা দেওয়া হতো বলে আব্বাস দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা খামে করে দেওয়া হতো।
নিজের ভাই আলকাছের নিখোঁজ হওয়ার বর্ণনা
জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক তাঁর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আলকাছ মাঝেমধ্যে তাঁদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন এবং কখনো দোকানেও বসতেন। তাঁর একটি মাছ ধরার নৌকা ছিল। সৌদি আরবে প্রায় ছয়-সাত বছর কাজ করার পর দেশে ফিরে আলকাছ চরদুয়ানীতে দুটি মাছ ধরার ট্রলার তৈরি করেছিলেন।
আব্বাস জানান, ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে র্যাব থেকে আলকাছকে ফোন করে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে।’
তিনি বলেন, র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলকাছ বাজারে আলোচনা করতেন। এ কারণে অন্য নৌকার মালিকেরা তাঁকে সতর্ক করে বলতেন, র্যাব তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।
ফোন পাওয়ার পর আর ফেরেননি আলকাছ
আব্বাসের দাবি, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন র্যাবের পরিচয় দিয়ে আলকাছকে ফোন করা হয়। সেদিন দুপুরে বাড়িতে ভাত খেয়ে তিনি বের হয়ে যান।
সন্ধ্যায় আলকাছের স্ত্রী তাঁকে ফোন করে জানান, র্যাবের ফোন পেয়ে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেখা করতে আলকাছ বটতলা-মানিকখালী এলাকায় গেছেন। কিন্তু পরে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
আব্বাস মল্লিক বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে তাঁর ভাই আলকাছের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

0 মন্তব্যসমূহ