ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিছক রাজনৈতিক নয়; এটি গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। একই সময়ে, ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে—বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে। ফলে সামনে থাকা এই দুটি আমন্ত্রণের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য আলাদা: একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য, অন্যটি আঞ্চলিক দায়িত্বের জন্য।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি ভারত সফরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ দরকার এবং একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক ব্যক্তির প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন। তবে দ্বিপক্ষীয় সফর, প্রত্যর্পণ এবং বিমসটেকের আঞ্চলিক দায়িত্ব—এই তিনটি প্রায়ই একসাথে মিশে যাচ্ছে।
মূলে প্রশ্ন হলো: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিকে কি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্বশর্ত করা হবে, নাকি সফরকেই দাবি আদায়ের একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে? এটি নিছক সফরে যাওয়া বা না যাওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সবচেয়ে কার্যকর পথ কী, সেটাই বিবেচনার বিষয়।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বারবার উচ্চারিত এবং দলটির পররাষ্ট্রনীতির মূল নির্দেশক। এই নীতির মানে হলো কোনো দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, তেমনি অন্ধ বিরোধিতাও নয়। প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের আলোকে বিচার করা।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর এবং বিমসটেক চেয়ার হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, দেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে এবং ভারতও বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করছে। তবে একটি বৈধ দাবি অটুট রাখা আর সেটিকে প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পূর্বশর্ত বানিয়ে ফেলা আলাদা বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিজেই একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেয়া, দাবি-দাওয়া নিয়ে দর-কষাকষি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়। অতীত অভিজ্ঞতা যেমন নিক্সনের চীন সফর ও বাজপেয়ীর লাহোর সফর প্রমাণ করে, বিরোধের সমাধান না হওয়া মানে আলোচনার বন্ধ নয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ গুরুত্বপূর্ণ, তবে পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোর সঙ্গে একক দাবিকে আটকে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রত্যর্পণে অগ্রগতি রাজনৈতিক আস্থার জন্য অপরিহার্য, তবে অন্যান্য ইস্যুতেও সমান্তরাল অগ্রগতি প্রত্যাশিত।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে। পানি বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে এবং নবায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীন হলেও দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক।
বিমসটেক চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ একটি আঞ্চলিক নেতৃত্বের সুযোগ। অনুপস্থিতি শুধু ভারতের সঙ্গে দূরত্ব নয়, আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ হারানো।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত দাবিতে দৃঢ় থাকা জরুরি, তবে দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা আলাদা। ‘প্রত্যর্পণ না হলে সফর নয়’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যানেলকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। বরং ‘দাবি অটুট থাকবে, সফরকে দর-কষাকষির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হবে’ কৌশলগতভাবে কার্যকর।
সফর যদি হয়, তবে সেটা শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বাংলাদেশের উচিত একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক প্যাকেজ নিয়ে যাওয়া, যার কেন্দ্রে থাকবে: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, গঙ্গা চুক্তির ন্যায্য নবায়ন, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, স্থলবন্দর-ভিত্তিক বাণিজ্য বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা এবং কানেকটিভিটিতে পারস্পরিক সুবিধা।
শেষ পর্যন্ত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির বাস্তবায়ন হবে দাবিতে দৃঢ়তা, আলোচনায় নমনীয়তা এবং ফলাফলে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং বিমসটেক চেয়ার হিসেবে ব্রিকসের সম্প্রসারিত অধিবেশনে অংশগ্রহণ যদি সেই স্বার্থ অর্জনের হাতিয়ার হয়, তবে সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। দাবি অটুট থাকবে, কূটনীতির দরজাও খোলা থাকবে; কারণ সাফল্য নির্ভর করে আমরা কী দাবি করছি না, বরং সেই দাবির মাধ্যমে বাংলাদেশ কী অর্জন করছে তার ওপর।

0 মন্তব্যসমূহ